বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনীতে টিটিপি সংশ্লিষ্টতা নিয়ে নিরাপত্তা সতর্কতা, বিভ্রান্তি ও গোয়েন্দা নজরদারির জোরদার প্রেক্ষাপট সাম্প্রতি বাংলাদেশ বিমান বিমানবাহিনীর কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তানের (টিটিপি) সঙ্গে যোগসাজশের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এ প্রেক্ষিতে, এরই মধ্যে দেশজুড়ে বিমানবাহিনীর ঘাঁটিগুলোতে সতর্কতা জারির পাশাপাশি বাহিনীর ভেতরে ব্যাপক গোয়েন্দা নজরদারি ও শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। দেশের মাঝে এমন একটি গুরুতর বিষয়কে “নাটক” বা “অতিরঞ্জন” হিসেবে অনেকেই ট্রেচারে নেমে তা প্রমাণের চেষ্টা করেছে। একটি নির্দিষ্ট বয়ান দ্রুত ছড়িয়ে দিয়ে বলছে, বাংলাদেশের বিমান বাহিনীর ভেতরে “জঙ্গি নাটক” সাজানো হয়েছে, কিছু অফিসারকে গুম করা হয়েছে, এবং পুরো বিষয়টি নাকি বিদেশি স্ক্রিপ্টে পরিচালিত। এই ফাঁকে, কেউ কেউ বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই এর গায়ে দুর্নাম লাগাতে চায়। তারা প্রচার করছে, এ কাজ ঐ গোয়েন্দা সংস্থার ডিজিএফআই করেছে। আমাদের দেশেরে এমন এক অবস্থা এখন, যেখানে গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই এর নাম নিলেই পাবলিককে খাওয়ানো যায়। অতএব, বাংলাদেশ বিমান বিমানবাহিনীতে ধর্মীয় পরিচয় ব্যবহারকারী কিছু উগ্রপন্থির খবর পাওয়ার বিষয়টা তাদের ঘাড়ে চরাও, যাতে করে জনগণকে ধোঁকা দেয়া যায় সেই সব উগ্রপন্থিদের আড়াল করতে। এতে করে তাদের দুটো লাভ, ডিজিএফআইকে জনগনের সামনে আস্থাহীন করা, এবং তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তানের (টিটিপি) র লোকজন যে আসলেই ধরা পড়েছে, সেটা আড়াল করা। মজার বিষয় হলো, তাদের মনগড়া বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে কিছু প্রশ্ন অমিমাংশিত। “গুম”, “গোপন আটক”, “বিদেশি নিয়ন্ত্রণ”- এসব অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগের প্রমান কোথায় ? এভাবে যদি বিশ্লেষণ করা হয়, তবে দেখা যাবে এমন ধরণেল অভিযোগকারির কাছে সঠিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্য, বা বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ নাই। তাদের সকল দাবিই সোশ্যাল মিডিয়া নির্ভর। আসলটা হলো, গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশ বিমান বিমানবাহিনীর কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তানের (টিটিপি) সঙ্গে ধর্মীয় উগ্রপন্থি আদর্শ ভিত্তিক যোগসাজশ আছে। তারা তাদের সেই পরিচয় ব্যবহার করে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সাথে পুনরায় সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে এবং গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনাকে লক্ষ্য করে নাশকতার পরিকল্পনা নিয়ে অনলাইনে ও অফলাইনে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতেই পুলিশ সদর দপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা ইউনিটগুলোকে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। তাদের সন্দেহজনক যোগাযোগ, গোপন সমন্বয় এবং রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাকে কেন্দ্র করে পরিকল্পনার তথ্য পাওয়ার পরই সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোকে সতর্ক করা হয়েছে। এই ধরনের সতর্কতা আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃত নিরাপত্তা প্রটোকলের অংশ। একটা বিষয় খুব পরিষ্কারভাবে বলা দরকার, যে, এই সতর্কতা দেশে কোনো আতঙ্ক তৈরির উদ্দেশ্যে নয়; বরং এটি একটি প্রতিরোধমূলক ও দায়িত্বশীল নিরাপত্তা ব্যবস্থা। দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় সরকার, গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশ, সশস্ত্র বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে। পরিস্থিতি সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং জনগণের আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। এটা হলো সত্য। অথচ লক্ষ্য করা যাচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং কিছু রাজনৈতিক মহলে বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা চলছে অনবরত। কেউ কেউ দাবি করছে, সরকারই বিরোধী রাজনৈতিক কর্মসূচি বা আন্দোলনের প্রসঙ্গ থেকে জনগণের দৃষ্টি সরাতে জঙ্গিবাদের বিষয় সামনে আনছে। কিন্তু এর সারবত্তা কতটুকু? পুরো ঘটনাটিকে বিচার বিশ্লেষণ করলে বলা যায়, এ রকম ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় এবং এটি জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুকে অপ্রয়োজনীয় রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত করার শামিল। বর্তমান সরকার মাত্র দুই মাস আগে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই জনগণের জীবনমান উন্নয়নে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। নিম্নআয়ের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রম সম্প্রসারণ, কৃষকদের সহায়তায় কৃষক কার্ড চালু ও পুনর্বিন্যাস, জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নয়ন, শিশুদের টিকা সংকট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগসহ বিভিন্ন জনবান্ধব কর্মসূচি ইতোমধ্যে ইতিবাচক ফল দিতে শুরু করেছে। সরকারের সামনে যখন জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য বাস্তব উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ রয়েছে, তখন অকারণে একটি স্পর্শকাতর নিরাপত্তা ইস্যু সামনে এনে অস্থিতিশীলতা তৈরির কোনো রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক উদ্দেশ্য সরকারের থাকরা কোনোই প্রয়োজন নাই । বরং জনগণের নিরাপত্তায় সরকার মনে করে, সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার পরও যদি প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হতো, তাহলে সেটিই হতো জনগণের নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের স্বার্থের পরিপন্থী আচরণ। একটি দায়িত্বশীল সরকার কখনো সম্ভাব্য হুমকিকে উপেক্ষা করতে পারে না। নিরাপত্তা ঝুঁকি প্রতিরোধে আগাম ব্যবস্থা গ্রহণ করাই রাষ্ট্র পরিচালনার স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি। বাংলাদেশ কি ধর্মীয় উগ্রবাদ দেখা যায় নি? সকলেই দেখেছি সেই সকল বেদনাদায়ক ঘটনা। অস্বিকার করার উপায় নাই, যারা এমন কাজে বা উগ্র আদর্শে লিপ্ত হন, তারা মানুষ হিসেবে চমৎকার। কিন্তু ধর্মের অপব্যাখ্যা তাদের অন্তরে এমন করে প্রবেশ করিয়ে দিয়েছে সুযোগ সন্ধানীরা যে, তারা কেবল মনে করে, “মানুষ বিপথগামী, ইসলাম বিপন্ন। তারা খোদার রক্ষক, ইসলামের রক্ষক।” এমন সিজোফ্রেনিক ভাবনার মায়াজালে অন্ধ হয়ে তারা উগ্র পথ বেছে নেয়। অনেককে হত্যা করার মধ্য দিয়েই সমাজ বা রাষ্ট্রে ইসলাম কায়েম হবে, এ বিশ্বাস ধরণ করেই ধ্বংসের কাজ করে। লক্ষ্য করা যায়, উগ্রবাদে প্ররোচনার ক্ষেত্রে সাধারণত কয়েকটি কৌশল একসঙ্গে প্রয়োগ করা হয়। প্রথমত, ধর্মীয় আয়াত বা হাদিসকে আংশিকভাবে এবং প্রেক্ষাপটবিহীনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যাতে মূল অর্থ বিকৃত হয়ে যায়। পাশাপাশি “আমরা বনাম তারা” ধরণের বিভাজন সৃষ্টি করে মানুষের মধ্যে ভিন্নমতাবলম্বীদের প্রতি সন্দেহ ও বিরূপতা গড়ে তোলা হয়। তরুণদের আবেগ, হতাশা ও পরিচয় সংকটকে কাজে লাগিয়ে তাদেরকে সহজেই প্রভাবিত করা হয় এবং একটি উদ্দেশ্যপূর্ণ ভূমিকায় যুক্ত হওয়ার অনুভূতি দেওয়া হয়। এ সময় উগ্রবাদীরা নিজেদেরকে একমাত্র সঠিক ব্যাখ্যাকারী হিসেবে উপস্থাপন করে, অন্য সব মতকে অগ্রাহ্য বা ভুল হিসেবে দেখায়। পুরো প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে এগোয়, যেখানে শুরুতে সাধারণ ধর্মীয় আলোচনা থাকলেও ক্রমান্বয়ে মতাদর্শকে আরও কঠোর ও একমুখী করে তোলা হয়। পাশাপাশি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে একমুখী তথ্য বারবার প্রচার করে একটি সংকীর্ণ চিন্তার পরিসর তৈরি করা হয়, যা ব্যক্তিকে ভিন্ন মত বা বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এমন ধারাতেই বাংলাদেশে এর বিস্তার। একইভাবে বা প্রক্রিয়ায়, বাংলাদেশ বিমান বিমানবাহিনীর কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তানের (টিটিপি) প্রভাব ফেলেছ অনেকের অন্তরে। যদি বাংলাদেশের নিকট ইতিহাসের দিকে তাকাই, তবে দেখা যায়, আমরা জঙ্গিবাদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছি। হলি আর্টিজান হামলা, ব্লগার হত্যা, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ, বিদেশি নাগরিক হত্যা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলাসহ বিভিন্ন ঘটনা প্রমাণ করেছে যে উগ্রবাদী নেটওয়ার্ক সুযোগ পেলে রাষ্ট্র ও সমাজকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করে। এসব ঘটনার অনেক ক্ষেত্রেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সফলভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে এবং অসংখ্য নাশকতার পরিকল্পনা আগেই প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে। ফলে জঙ্গিবাদকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা বা এটিকে হালকাভাবে দেখা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। রাজনৈতিক অবজারভাররা মনে করে, জঙ্গিবাদ কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা মতাদর্শের একক সমস্যা নয়; এটি পুরো রাষ্ট্র, সমাজ এবং জনগণের জন্য হুমকি। এ ধরনের উগ্রবাদ আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক, অনলাইন প্রচারণা এবং বিভ্রান্তিকর মতাদর্শের মাধ্যমে বিস্তার লাভ করে। ফলে সরকার পরিবর্তন বা রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলালেই এই হুমকি সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যাবে, এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। এখানে আরেকটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া জরুরি, – কোনো সতর্কবার্তা জারি মানেই দেশে বড় ধরনের হামলা ঘটতে যাচ্ছে, এমন নয়। বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আগাম গোয়েন্দা নজরদারি ও নিরাপত্তা প্রস্তুতির কারণেই সম্ভাব্য হুমকি প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়। সরকারের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো সেই প্রতিরোধমূলক কৌশল অনুসরণ করেই কাজ করছে এবং করবে। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা অফিসাররা জোর দিয়েই বলছেন, অতীতে যখনই জঙ্গিবিরোধী অভিযান পরিচালিত হয়েছে, তখন একটি অংশ সেটিকে “নাটক” বা “অতিরঞ্জন” হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছে। গণতান্ত্রিক সমাজে সরকারের সমালোচনা অবশ্যই থাকতে পারে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকাণ্ড নিয়েও প্রশ্ন তোলা নাগরিক অধিকারের অংশ। তবে এমন সমালোচনা যদি জনগণের মধ্যে বাস্তব নিরাপত্তা ঝুঁকি সম্পর্কেও অবিশ্বাস তৈরি করে, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াবে।
নিরাপত্তা সতর্কতা নাকি বিভ্রান্তি? টিটিপি ইস্যু ঘিরে বাস্তবতা ও অপপ্রচারের দ্বন্দ্ব
12