ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন ও দখলদারির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে যুক্তরাজ্য। দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, ফিলিস্তিনের অধিকৃত ভূখণ্ডে ইসরায়েলের দখলদারিত্ব অবৈধ।
একই সঙ্গে অবৈধ ইসরায়েলি বসতি থেকে পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা, বসতি সম্প্রসারণে সহায়তাকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং যুক্তরাজ্যে অবৈধ বসতির বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে ব্রিটিশ সরকার। এসব পদক্ষেপের বিস্তারিত ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড হাউস অব কমন্সে দেওয়া বক্তব্যে তুলে ধরেন।
মিলিব্যান্ড বলেন, ব্রিটেন এখন শুধু পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ ও ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতনের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করবে না; এসব ঠেকাতে সরাসরি পদক্ষেপও নেবে। তবে এই অবস্থান ইসরায়েলি জনগণের বিরুদ্ধে নয় বলেও স্পষ্ট করেন তিনি।
ইসরায়েল রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও অস্তিত্বের অধিকারকে সমর্থনের পাশাপাশি ফিলিস্তিনি জনগণের স্বাধীনতা ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকারও সমর্থন করে যুক্তরাজ্য। ব্রিটিশ সরকারের মতে, দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানই ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি জনগণের দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও নিরাপত্তার বাস্তব পথ।
মিলিব্যান্ড জানান, ১৯৯৩ সালে অসলো শান্তি চুক্তির সময় পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৭ লাখ ৭০ হাজার হয়েছে।
তার অভিযোগ, বসতি সম্প্রসারণের পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ভাঙা, উচ্ছেদ, জমিতে যেতে বাধা এবং সহিংসতার ঘটনাও বেড়েছে। ২০২৩ সাল থেকে পশ্চিম তীরে ৬৫টি ফিলিস্তিনি সম্প্রদায় পুরোপুরি উচ্ছেদ হয়েছে এবং বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা ও বিভিন্ন সরকারি কর্মকাণ্ডের কারণে ৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি বাড়িঘর হারিয়েছেন বলে জানান তিনি।
বিশেষ করে পশ্চিম তীরের ই-১ এলাকায় বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তার মতে, সেখানে বসতি নির্মাণ হলে পূর্ব জেরুজালেম ও পশ্চিম তীরের মধ্যে ইসরায়েলি বসতির একটি ধারাবাহিক অঞ্চল তৈরি হবে। এতে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড বিভক্ত হয়ে পড়বে এবং ভবিষ্যতে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান আরও কঠিন হবে।
বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান মিলিব্যান্ড। তিনি বলেন, সহিংসতায় জড়িত আরও কয়েকজন উগ্রপন্থী বসতি স্থাপনকারীর ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হবে। বসতি সম্প্রসারণে অর্থায়ন বা সহায়তা করা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানও নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসবে।
অবৈধ বসতি থেকে পণ্য আমদানিতে নতুন নিষেধাজ্ঞা আগামী ৬ থেকে ৯ মাসের মধ্যে কার্যকর করার কথা জানিয়েছে যুক্তরাজ্য। বসতি নির্মাণ, অবকাঠামো, অর্থায়ন ও আবাসন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে ধর্মীয় প্রয়োজনীয় কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে ছাড় থাকবে।
গাজায় ইসরায়েলি সামরিক কর্মকাণ্ড নিয়েও সমালোচনা করেন মিলিব্যান্ড। তিনি বলেন, ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকার তৈরি করলেও এরপর গাজায় যা ঘটেছে, তার সবকিছুকে এর মাধ্যমে বৈধতা দেওয়া যায় না।
গাজায় প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি ও অবকাঠামো ধ্বংসের কথা উল্লেখ করে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগের বিষয়ে আন্তর্জাতিক তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি। একই সঙ্গে হামাসকে ভবিষ্যৎ গাজার শাসনব্যবস্থায় কোনো ভূমিকা না দেওয়ার পক্ষে মত দেন। হামাসকে অস্ত্র ত্যাগ এবং সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করতে হবে বলেও জানান ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
গাজার মানবিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় আরও সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাজ্য। দেশটির সহায়তায় পরিচালিত হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবা বাড়ানো এবং গুরুতর আহত শিশুদের চিকিৎসায় ব্রিটিশ বিশেষজ্ঞদের কাজ করার কথা জানান মিলিব্যান্ড।
ব্রিটিশ সরকারের নতুন নীতির লক্ষ্য দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনা ধরে রাখা। মিলিব্যান্ড বলেন, একদিকে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের কথা বলা এবং অন্যদিকে পশ্চিম তীরে এমন কর্মকাণ্ড চলতে দেওয়া, যা এই সমাধানকে অসম্ভব করে তোলে—এ অবস্থান থেকে সরে আসবে ব্রিটেন।
এর অংশ হিসেবে অবৈধ বসতি থেকে পণ্য আমদানি বন্ধ, বসতির বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ, বসতি সম্প্রসারণে সহায়তাকারীদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা এবং দখলদারিত্বে সহায়তা করতে পারে এমন কিছু পণ্যের রপ্তানি লাইসেন্স প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাজ্য।