বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে নতুন কৌশল নিয়েছে বাংলাদেশ। ব্যয়বহুল ওয়েফার ফ্যাব্রিকেশন প্ল্যান্ট স্থাপনের পথে না গিয়ে আপাতত চিপ ডিজাইন, ডিজাইন ভেরিফিকেশন, টেস্টিং ও প্যাকেজিংয়ের মতো উচ্চমূল্যের খাতে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার ও শিল্পসংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো দক্ষ প্রকৌশলী। এই মানবসম্পদকে কাজে লাগিয়ে তুলনামূলক কম বিনিয়োগে বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর ভ্যালু চেইনে দ্রুত যুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এ লক্ষ্য সামনে রেখে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের জন্য বড় ধরনের নীতিগত সহায়তা দেওয়া হয়েছে। সরকার ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত ইলেকট্রনিক ডিজাইন অটোমেশন (ইডিএ) টুলস, সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন সফটওয়্যার, উন্নত প্যাকেজিং যন্ত্রপাতি এবং বিশেষায়িত টেস্টিং সরঞ্জামের ওপর শুল্ক ও ভ্যাটে উল্লেখযোগ্য ছাড় দিয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সুবিধা দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আস্থা দেবে। বর্তমানে বাংলাদেশের সেমিকন্ডাক্টর খাত থেকে বছরে প্রায় ৮ মিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় আসে। সরকারের লক্ষ্য, ২০৩০ সালের মধ্যে এই খাতকে ১ বিলিয়ন ডলারের শিল্পে পরিণত করা।
বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআইএ) সভাপতি এম এ জব্বার বলেন, সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে সফল হতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও স্থিতিশীল নীতি প্রয়োজন। ২০৩১ সাল পর্যন্ত সুবিধা বহাল রাখার সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারীদের কাছে ইতিবাচক বার্তা দেবে।
তিনি বলেন, ওয়েফার ফ্যাব্রিকেশন অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং এতে বিপুল মূলধন ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা প্রয়োজন। তাই আপাতত আইসি ডিজাইন, ডিজাইন ভেরিফিকেশন, এফপিজিএ, এমবেডেড সিস্টেম, টেস্টিং এবং প্যাকেজিং সেবার মতো খাতে বাংলাদেশের দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক এবং বিডার জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর টাস্কফোর্সের সদস্য এ বি এম হারুন-অর-রশিদ বলেন, শুল্ক ও ভ্যাট ছাড়ের ফলে বিশ্ববিদ্যালয়, স্টার্টআপ এবং গবেষকদের খরচ কমবে। পাশাপাশি টেস্টিং ও প্যাকেজিং খাতে নতুন বিনিয়োগও উৎসাহিত হবে।
তিনি জানান, দেশে প্রতি বছর প্রায় ১৩ হাজার ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং এবং প্রায় ২৬ হাজার কম্পিউটার সায়েন্স গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছেন। ফলে সেমিকন্ডাক্টর খাতের জন্য বড় মানবসম্পদভিত্তি তৈরি হচ্ছে।
সরকারের রোডম্যাপ অনুযায়ী, স্বল্পমেয়াদে চিপ ডিজাইন, মধ্যমেয়াদে টেস্টিং ও প্যাকেজিং এবং দীর্ঘমেয়াদে ওয়েফার ফ্যাব্রিকেশনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
ইতোমধ্যে উলকাসেমি, নিউরাল সেমিকন্ডাক্টর, প্রাইম সিলিকন টেকনোলজি ও সিলিকনোভার মতো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক বাজারে সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন ও প্রকৌশল সেবা দিচ্ছে।
সিলিকনোভার পরিচালক ও টেকনিক্যাল প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. শাফিল হোসাইন বলেন, বাংলাদেশের প্রকৌশলীরা এখন ১৮০ ন্যানোমিটার থেকে শুরু করে ২ ন্যানোমিটার প্রযুক্তির অত্যাধুনিক চিপ ডিজাইন প্রকল্পেও কাজ করছেন।
তার মতে, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প নিয়ে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা হলো—এই খাতে প্রবেশ করতে হলে শুরুতেই ফ্যাব্রিকেশন প্ল্যান্ট তৈরি করতে হবে। বাস্তবে বিশ্বজুড়ে এই শিল্পের বড় অংশই চিপ ডিজাইন, ভেরিফিকেশন এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ (আইপি) উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত। এসব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ এখন প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা অর্জন করছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু কর-শুল্ক ছাড় যথেষ্ট নয়। দক্ষ জনবল তৈরির জন্য আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন। বর্তমানে অনেক প্রকৌশলীকে শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ করে তুলতে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ নিতে হয়।
এ কারণে সেন্টার অব এক্সিলেন্স গড়ে তোলা, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো, আধুনিক ডিজাইন টুল সহজলভ্য করা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালুর পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
বিশ্ববাজারে সেমিকন্ডাক্টরের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বৈদ্যুতিক যানবাহন, ৫জি প্রযুক্তি এবং অটোমেশনের বিস্তারের কারণে আগামী বছরগুলোতে এই শিল্প আরও বড় হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্বাস, সঠিক নীতি, দক্ষ জনবল এবং ধারাবাহিক বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বাংলাদেশ চিপ ডিজাইন, ভেরিফিকেশন, টেস্টিং সাপোর্ট ও প্রকৌশল সেবার গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।