জাতিসংঘের চার দিনের সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও সম্ভাবনাকে বিশ্বমঞ্চে সুদৃঢ়ভাবে তুলে ধরেছেন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন। তার ভাষ্য, এ সফরের মধ্য দিয়ে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাস, আত্মপ্রত্যয় ও আত্মমর্যাদাবোধ নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।
রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) সকালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে অংশগ্রহণ শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশে ফেরেন। এরপর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন মাহ্দী আমিন।
মাহ্দী আমিন বলেন, জাতিসংঘ সফরটি অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও সফল হয়েছে। দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশে জনগণের ভোটে নির্বাচিত কোনো সরকারপ্রধান বিশ্বমঞ্চে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। সফরের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে উচ্চতর অবস্থানে নিয়ে গেছেন। বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানেরা তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র বলেন, মাত্র চার দিনের সংক্ষিপ্ত সফরে প্রধানমন্ত্রী ৩০টি কর্মসূচিতে অংশ নেন। এর মধ্যে ছিল গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক বৈঠক। তিনি জাতিসংঘের আটটি প্রধান আয়োজনে অংশ নেন এবং সাতটিতে বক্তব্য দেন। এর মধ্যে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া তার ভাষণ ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ।
মাহ্দী আমিন জানান, সফরের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সরকার দুটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এর একটি ছিল সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যটি রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে। এ ছাড়া পরিবেশ ও স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে আরও দুটি বৈশ্বিক উচ্চপর্যায়ের আয়োজনে প্রধানমন্ত্রী অংশ নেন।
জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ
জাতিসংঘে দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে মাহ্দী আমিন বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী। তরুণ ও নারীদের পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্যও সুনির্দিষ্ট নীতি ও পরিকল্পনার কথা তিনি বলেছেন।
এসব পরিকল্পনা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে উল্লেখ করে মাহ্দী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী শুধু বাংলাদেশের উন্নয়ন নিয়ে কথা বলেননি; বিশ্ব শান্তির পক্ষেও জোরালো অবস্থান তুলে ধরেছেন।
ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য দিতে উঠলে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল অধিবেশন থেকে বেরিয়ে প্রতিবাদ জানায়। তাঁর মতে, এর মধ্য দিয়ে বিশ্ব শান্তির পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে।
বাংলাদেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে বোয়িং চুক্তি
বোয়িংয়ের কাছ থেকে উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মাহ্দী আমিন বলেন, কোনো পক্ষের চাপের কারণে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। দ্বিপাক্ষিক স্বার্থ বিবেচনায় নিয়েই আগে থেকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, চুক্তি স্বাক্ষরের সময় প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন না। তবে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
সফরকালে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র সরকারের মধ্যে ‘স্ট্র্যাটেজিক সিভিল নিউক্লিয়ার কো-অপারেশন’ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের কথাও জানান মাহ্দী আমিন। প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতির বাইরে পৃথক একটি সাইডলাইন বৈঠকে এ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয় বলে তিনি জানান।
মাহ্দী আমিন আরও বলেন, সফরে যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের কর্মসূচির পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী মোট ১১টি দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক ও আলোচনায় অংশ নেন। এসব আলোচনায় বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ ও জনগণের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি নিরাপত্তা ও রোহিঙ্গা ইস্যুতে আলোচনা
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠকে জ্বালানি নিরাপত্তা গুরুত্ব পেয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র। বর্তমান সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ ও কার্যকর আলোচনার বিষয়ে দ্বিপাক্ষিকভাবে আলোচনা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে মাহ্দী আমিন বলেন, আসিয়ানভুক্ত দেশ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য কাজ করা বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে এ বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। সংকট সমাধানে বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা বাংলাদেশের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে বলেও জানান তিনি।
রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মানবিক ভূমিকারও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় প্রশংসা করেছে বলে দাবি করেন মাহ্দী আমিন।
তিনি বলেন, সফরের দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক বৈঠকগুলোতে বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও বিশ্বনেতারা বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করার এবং পাশে থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।
মিরপুরের হামলা: দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানালেন মাহ্দী আমিন
রাজধানীর মিরপুরে একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে সাম্প্রতিক হামলার বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মাহ্দী আমিন বলেন, জাতিসংঘ সফরের সময় ঘটনাটি ঘটেছে। তার জানা মতে, ওই ঘটনায় নয়জনকে দ্রুত গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তিনি বলেন, সরকারের অবস্থান এ বিষয়ে স্পষ্ট। কেউ সরকারি কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের পরিচয় ব্যবহার করে আইনবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত হলে আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মাহ্দী আমিন বলেন, এ ঘটনায় ইতিমধ্যে অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আইন দ্রুত কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
দেশের কোথাও বিচ্ছিন্ন বা বিক্ষিপ্ত কোনো ঘটনা ঘটলে দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি করেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র। দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর রয়েছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, আইন লঙ্ঘন করে কেউ অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করলে সরকার তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে।
ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন ও সহকারী প্রেস সচিব কেএম নাজমুল হক উপস্থিত ছিলেন।