ছুটি শেষে উত্তরার মাইলস্টোন প্রাঙ্গণ। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলেকে নিতে এসেছেন মো. রুবেল মিয়া। কাঁধে ছেলের ব্যাগ, শক্ত করে এক হাতে ধরেছেন ছোট ছেলে তাসফিকের হাত। অন্য হাতেই হয়তো জায়গা পেত বড় ছেলে তানভীরের হাতও। কিন্তু দীর্ঘ একটি বছর কেটে গেল, তানভীর আর কোনোদিন বাবার এই হাতটি ধরেনি… ধরবেও না কখনো।
রুবেল মিয়া বলেন, “ব্যাংকে একটা কাজে গিয়েছিলাম। তখনই শুনি স্কুলে বিমান পড়েছে। এসে দেখি, আমার ছেলে যে ভবনটাতে পড়ত, ঠিক ওই ভবনেই বিমানটা ক্র্যাশ করেছে। শুধু আগুন জ্বলছিল। আমি পাগলের মতো ওকে খুঁজছিলাম, কিন্তু কোথাও পাইনি। আমি তানভীরকে আর জীবিত পাইনি। বার্ন ইউনিট থেকে তানভীরের মরদেহ হস্তান্তর করা হয়। তারপর আমরা ওকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে চলে যাই। ওখানেই ওকে মাটি দিই।”
২০২৫ সালের ২১ জুলাইয়ের এই অভিশপ্ত দিনেই ঢাকার উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসে বিধ্বস্ত হয়েছিল বিমান বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান। চোখের পলকে ঘটে যাওয়া সেই তাণ্ডব এক মুহূর্তে খালি করে দিয়েছিল এই বাবার কোল, কেড়ে নিয়েছিল পরিবারের সব আলো।
আজও স্কুলের শত শত শিক্ষার্থীর ভিড়ে নিজের বুক খালি করে দেওয়া তানভীরকেই যেন খুঁজে বেড়ান এই বাবা। প্রতিটি শিশুর হাসিতে তিনি শুনতে পান নিজের সন্তান হারানোর বেদনার প্রতিধ্বনি।
তিনি বলেন, “আমি প্রতিদিন দুই ছেলেকে একসঙ্গে স্কুলে নিয়ে আসতাম। বড় ছেলে ক্লাস ক্যাপ্টেন ছিল। আমি ছোট ছেলেকে ক্লাসে দিয়ে ফেরার সময় গেটে ওর সঙ্গে কথা বলে যেতাম। ও কথা বলত আর মুচকি হাসত। একটি বছর চলে গেছে, কিন্তু আমার ছেলের সেই মুখের হাসি এখনো আমার চোখে ভাসে। স্কুলে ছোট ছেলেকে নিয়ে আসি ঠিকই, কিন্তু শত শত ছাত্রছাত্রীর মাঝে আমি তানভীরকে এখন আর খুঁজে বেড়াই।”
শোকার্ত এই বাবার অভিযোগ, এখনো যখন মাথার ওপর দিয়ে প্রশিক্ষণ বিমান উড়ে যায়, বুকটা কেঁপে ওঠে আতঙ্কে। ছেলে হারানোর সেই বিভীষিকা যেন রক্তক্ষরণ বাড়িয়ে দেয় বুকের ক্ষতটিতে।
তিনি আরও বলেন, “একজন দুরন্ত, চঞ্চল ছেলে হেলতে-দুলতে মনের আনন্দ নিয়ে স্কুলে এসেছিল, আর সে ফিরেছে লাশ হয়ে… এই স্মৃতি একজন বাবা হিসেবে আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না।”
“ঘন ঘন প্রশিক্ষণ বিমান ওদের সময়সূচি অনুযায়ী এখনো প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। এখানে কোনো বিমান ওঠানামা বন্ধ হয়নি। এখন আগের চেয়ে বিমান প্রশিক্ষণ মহড়া আরও বেশি হচ্ছে। আমরা তো সবসময় আতঙ্কে থাকি—না জানি আবার একটা ঘটনা ঘটে।”
সেদিনের সেই নারকীয় বিমান দুর্ঘটনায় মাইলস্টোনের নিষ্পাপ ২৮ জন শিশুসহ প্রাণ হারায় মোট ৩৫ জন। সেই ধ্বংসস্তূপে আজও পড়ে আছে প্রাণ হারানো শিশুদের টিফিন বক্স, খাতা আর জুতা। পোড়া দেয়ালের কালো দাগগুলো আজও যেন চিৎকার করে জানিয়ে দেয়; সেদিন কতটা তীব্র আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছিল মাইলস্টোনের কোমল ফুলের বাগান।
সেই ভয়াবহ স্মৃতি আজও তাড়া করে বেড়ায় স্কুলটির শিক্ষিকা মেহরুন্নেসাকে। নিজের চোখের সামনে সন্তানতুল্য কোমলমতি শিক্ষার্থীদের আগুনের শিখায় দগ্ধ হওয়ার দৃশ্য আর সেই করুণ আর্তনাদ আজও কাঁদায় তাকে।
তিনি বলেন, “শেষ চলে যাওয়া শিক্ষার্থী তাসনিয়াকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘বাবা, কেমন লাগছে আজ?’
ও আমাকে বলেছিল, ‘মিস, আজকে রাতটা তুমি আমার কাছে থেকে যাও না? আমার সঙ্গে আজকে রাতে একটু গল্প করো না?’
আমি ওকে বলেছিলাম, ‘বাবা, মিস তো আজকে সরাসরি স্কুল থেকে এসেছে। আমি কোনো কাপড়চোপড় নিয়ে আসিনি। কাল শুক্রবার। আমি খুব সকালে তোমার কাছে চলে আসব। কাল সারাদিন আমি তোমার সঙ্গে থাকব। মিস অনেক গল্প শোনাবে তোমাকে।’
কিন্তু আল্লাহ তাআলা সেই শেষ সুযোগটা তাসনিয়ার সঙ্গে আমাকে দেননি। আমি ওকে আর গল্প শোনাতে পারিনি।”
বিমান দুর্ঘটনার মানসিক যন্ত্রণা কাটিয়ে ক্লাসে ফিরেছে শিক্ষার্থীরা। তবে এখনো অনেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি। ক্ষত নিয়ে বারবার হাসপাতালে ছুটতে হচ্ছে। আর তাই মানসিকভাবে এখনো বিপর্যস্ত অনেক শিক্ষক-শিক্ষার্থী।
এই শিক্ষিকা আরও বলেন, “এখানে আমরা সবাই ট্রমাটাইজড। প্রতিটি শিক্ষক, প্রতিটি শিক্ষার্থী, প্রতিটি স্টাফ।”
মাইলস্টোন কর্তৃপক্ষের দাবি, এই শোক সামলে ওঠার আপ্রাণ চেষ্টা চলছে। কোমলমতি শিশুদের মানসিক ধাক্কা কাটাতে তারা পাশে আছেন, থাকবেন সবসময়।
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল নুরুন নবী বলেন, “দুর্ঘটনার দিন থেকে শুরু করে আহত বাচ্চাগুলো যতদিন হাসপাতালে ছিল, আমরা একটা টিম ওখানেই রেখেছিলাম। আমরা প্রায় সবাইকে সময়ে সময়েই আর্থিকভাবে সাহায্য করেছি। যে আহত বাচ্চাগুলো আছে, তাদের কাছ থেকে এক পয়সাও নিচ্ছি না। তাদের সম্পূর্ণ বিনা খরচে পড়াচ্ছি। আর যারা মারা গেছে, তাদের আত্মীয়-স্বজন যদি এখানে থাকে, তাদেরও সবাইকে বিনা খরচে পড়ানো হচ্ছে।”
“যে বাচ্চাগুলো এখনো হাসপাতালে যায়, আমরা তাদের জন্য পরিবহন সুবিধা দিচ্ছি। ফিজিওথেরাপিটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমরা একটি ফিজিওথেরাপি সেন্টারের সঙ্গে সমন্বয় করেছি, যেখানে আমাদের বাচ্চারা গিয়ে নিয়মিত ফিজিওথেরাপি নিতে পারে।”
“এ ছাড়া যদি কোনো মেডিক্যাল সমস্যা হয়, তারা আমাদের এখানে আসবে। আমাদের মেডিক্যাল অফিসার আছেন। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি তাদের সহযোগিতা করার।”
ঘটনার এক বছর পেরিয়ে গেলেও সেদিনের আতঙ্ক এখনো কাটেনি শিক্ষার্থীদের। মাইলস্টোনের আকাশে এখনো উড়ে একের পর এক প্রশিক্ষণ বিমান। আর তাতেই তাদের মনে পড়ে যায়—এই আকাশ থেকেই নেমে এসেছিল তাদের সহপাঠীদের মৃত্যুর পরোয়ানা।
একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী আব্দুল বাসেদ রাফাজ বলেন, “সেদিন ক্যান্টিনে ছিলাম। হঠাৎ বিকট শব্দ শুনে এসে দেখি বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। এখনো যখন প্রশিক্ষণ বিমান উড়ে, তখন ভয় হয়।”
বিমান উড়ার শব্দ শুনলেই এখনো আতঙ্কিত হয়ে পড়েন আরেক শিক্ষার্থী রাফিয়া। তিনি বলেন, “এই স্মৃতি কখনো ভুলতে পারব না। অনেক শব্দ করে যখন বিমান যায়, তখন আতঙ্ক কাজ করে। মনে হয়, এই বুঝি আবার বিমান পড়ে গেল!”
সময় হয়তো স্বাভাবিকের পথে এগিয়ে যাবে। ক্যালেন্ডার বদলাবে বছর বছর। কিন্তু মাইলস্টোনের পোড়া দেয়াল আর আকাশে উড়ে যাওয়া প্রতিটি বিমানের ডানায় চিরকাল লেগে থাকবে ২৮টি ঝরে যাওয়া ফুলের অলিখিত দীর্ঘশ্বাস… আর একঝাঁক স্বজনহারা মানুষের চিরন্তন হাহাকার।