মহাকাশ জয়—একসময় যে শব্দবন্ধটি যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন কিংবা ইউরোপের মতো শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর সামর্থ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিল, একবিংশ শতাব্দীতে তার অর্থ অনেকটাই বদলে গেছে। মহাকাশ এখন শুধু চাঁদে মানুষ পাঠানো বা দূর গ্রহে অভিযান পরিচালনার বিষয় নয়; কৃষি, আবহাওয়া, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, যোগাযোগ, নৌপরিবহন, পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন, জাতীয় নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির সঙ্গেও এর সম্পর্ক ক্রমেই গভীর হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ মহাকাশ প্রযুক্তিতে নিজস্ব সক্ষমতা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিলে সেটিকে নিছক উচ্চাভিলাষ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
এই বাস্তবতায় রকেট ও স্যাটেলাইট উৎপাদন এবং সম্ভাব্য উৎক্ষেপণ সক্ষমতা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সরকারের একটি সাহসী ও দূরদর্শী পদক্ষেপ। একটি দেশের ভবিষ্যৎ শুধু জিডিপি, রপ্তানি বা অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে না; প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে কত দ্রুত নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারছে, তার ওপরও নির্ভর করে। সেই বিবেচনায় বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন প্রতিষ্ঠান—স্পারসোর সক্ষমতা সম্প্রসারণ এবং রকেট, স্যাটেলাইট ও মহাকাশশিল্পের সম্ভাবনা যাচাইয়ের উদ্যোগ সময়োপযোগী। সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত নথিতে রকেট উৎপাদন ও উৎক্ষেপণকেন্দ্র, স্যাটেলাইট উৎপাদন ও সংযোজন-পরীক্ষা সুবিধা এবং মহাকাশ শিল্পপার্ক স্থাপনের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার কথাও রয়েছে। আজকের এই বিনিয়োগ ও পরিকল্পনা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে তা শুধু মহাকাশ প্রযুক্তিতে সক্ষমতা বাড়াবে না; আগামী দিনে উচ্চপ্রযুক্তির শিল্পায়ন, দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি, প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা এবং দেশের কৌশলগত স্বাধীনতারও শক্ত ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশ অবশ্য একেবারে শূন্য থেকে শুরু করছে না। ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত স্পারসো দীর্ঘদিন ধরে কৃষি, বন, মৎস্য, পানি সম্পদ, ভূমি ব্যবহার, আবহাওয়া, পরিবেশ ও সমুদ্রবিজ্ঞানে দূর অনুধাবন ও মহাকাশ প্রযুক্তি ব্যবহার করে আসছে। ২০১৮ সালে একটি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের মাধ্যমে বাংলাদেশ নিজস্ব যোগাযোগ ও সম্প্রচার স্যাটেলাইট পরিচালনাকারী দেশের তালিকায় যুক্ত হয়। তবে স্যাটেলাইট ব্যবহার, স্যাটেলাইট নির্মাণ এবং রকেট উৎক্ষেপণ—তিনটি ভিন্ন মাত্রার সক্ষমতা; বিশেষ করে রকেট প্রযুক্তি আয়ত্ত করা অত্যন্ত জটিল, ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। তাই কুয়াকাটার সম্ভাব্য স্পেসপোর্টকে কোনো চূড়ান্ত গন্তব্য হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশ সক্ষমতা অর্জনের একটি সম্ভাব্য সূচনা বিন্দু হিসেবে দেখা উচিত।
বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের কুয়াকাটা সমুদ্রতীরে একটি পূর্ণাঙ্গ মহাকাশবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা সামনে এসেছে। এর অবকাঠামো, প্রযুক্তি, ব্যয়, অর্থনৈতিক কার্যকারিতা এবং সরকারি-বেসরকারি অংশগ্রহণ—সবকিছুই বৈজ্ঞানিক, প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক সমীক্ষার ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে। যথাযথ পরিকল্পনা ও ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ ছাড়া ‘মহাকাশ জয়ের’ উচ্চাকাঙ্ক্ষা সহজেই একটি ব্যয়বহুল মর্যাদা প্রকল্পে পরিণত হতে পারে। বিপরীতে ধাপে ধাপে বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, বেসরকারি অংশগ্রহণ ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে পারলে কুয়াকাটার উদ্যোগটি শুধু উৎক্ষেপণকেন্দ্র নয়, বাংলাদেশের উচ্চপ্রযুক্তির শিল্প, গবেষণা, উদ্ভাবন ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির নতুন ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
কুয়াকাটার স্পেসপোর্টকে শুধু রকেট উৎক্ষেপণকেন্দ্র হিসেবে দেখলে এর সম্ভাবনা সীমিত হয়ে যাবে। সম্ভাব্য পরিকল্পনায় রকেট ও স্যাটেলাইট উৎপাদন, পরীক্ষা এবং মহাকাশ শিল্পপার্কের মতো অবকাঠামো রয়েছে। লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি সমন্বিত মহাকাশ প্রযুক্তি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে উৎপাদন ও উৎক্ষেপণের পাশাপাশি মহাকাশ থেকে সংগৃহীত তথ্য কৃষি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ ও সমুদ্র অর্থনীতিতে ব্যবহার করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাগার, বেসরকারি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও তথ্য বিশ্লেষণ শিল্পকে যুক্ত করা গেলে এর ভিত্তিতে একটি পূর্ণাঙ্গ মহাকাশ অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব।
কুয়াকাটার ভৌগোলিক অবস্থান সম্ভাব্য উৎক্ষেপণকেন্দ্র হিসেবে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা দিতে পারে। অক্ষাংশ, উৎক্ষেপণের দিক, কক্ষপথ, জনবসতি, সমুদ্র ও আকাশপথ এবং পৃথিবীর ঘূর্ণনগত সুবিধা বিবেচনায় নিতে হয়। বিষুবরেখার তুলনামূলক কাছাকাছি অবস্থান পূর্বদিকে উৎক্ষেপণে কিছু জ্বালানি ও পেলোড সুবিধা দিতে পারে। বঙ্গোপসাগরের তীরে হওয়ায় সমুদ্রের দিকে নির্ধারিত উৎক্ষেপণপথ ব্যবহারের সুযোগও রয়েছে, যা রকেটের বিচ্ছিন্ন অংশ জনবসতিপূর্ণ এলাকায় পড়ার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে। তবে এসব সুবিধা নিশ্চিত করতে পূর্ণাঙ্গ প্রযুক্তিগত ও নিরাপত্তা সমীক্ষা অপরিহার্য। তবে কুয়াকাটার মাটি, ভূপ্রকৃতি, আবহাওয়া, সমুদ্র ও আকাশপথ, জনবসতি, নিরাপত্তা, পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের সুযোগ বিবেচনায় নিতে হবে। প্রয়োজনে কুয়াকাটার পাশাপাশি দক্ষিণাঞ্চলের বিকল্প স্থানও তুলনা করতে হবে। কুয়াকাটার পক্ষে আবেগ নয়, বিজ্ঞানভিত্তিক মূল্যায়নই হতে হবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভিত্তি।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অবকাঠামোর চেয়ে দক্ষ মানবসম্পদ। একটি উৎক্ষেপণকেন্দ্রের জন্য রকেট ও উৎক্ষেপণ প্যাড যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন চালনা ব্যবস্থা, নির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণ, যোগাযোগ, অনুসরণ ব্যবস্থা, নিরাপত্তা এবং উচ্চ দক্ষতার প্রকৌশলী ও গবেষক। রকেট প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিকস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, পদার্থবিজ্ঞান, উপকরণ বিজ্ঞান, রোবোটিকস ও মহাকাশ প্রকৌশলে বিশেষায়িত দক্ষতা তৈরি করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়, স্পারসো ও বেসরকারি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে ছোট স্যাটেলাইট ও কিউবস্যাটের নকশা, সংযোজন ও পরীক্ষার মাধ্যমে এ যাত্রা শুরু করা যেতে পারে। বিদেশে প্রশিক্ষণ, যৌথ গবেষণা এবং প্রবাসী বাংলাদেশি বিজ্ঞানীদের সম্পৃক্ত করাও জরুরি।
মনে রাখতে হবে, মহাকাশ প্রযুক্তি কেনা যায়, কিন্তু মহাকাশ সক্ষমতা কেনা যায় না। বিদেশি রকেট কিনে কয়েকটি উৎক্ষেপণ করা সম্ভব; কিন্তু নিজস্ব প্রযুক্তি, প্রকৌশলী, গবেষণাগার ও শিল্পভিত্তি ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে প্রকৃত মহাকাশ সক্ষমতা অর্জন সম্ভব নয়। তাই কুয়াকাটার মহাকাশবন্দরের ভিত্তিপ্রস্তরের আগেই ভবিষ্যৎ মহাকাশ প্রকৌশলী তৈরির ভিত্তি স্থাপন করতে হবে। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মহাকাশবিজ্ঞান ও প্রকৌশলের বিশেষায়িত শিক্ষা এবং গবেষণায় দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন প্রয়োজন।
মহাকাশে বিনিয়োগের অর্থনৈতিক সুফলও শুধু রকেট উৎক্ষেপণের আয় দিয়ে বিচার করা যাবে না। কৃষিতে স্যাটেলাইট তথ্য ব্যবহার করে ফসলের অবস্থা, খরা, বন্যা, জলাবদ্ধতা ও ভূমির পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা যায়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও নদীভাঙন মোকাবিলায় দ্রুত তথ্য পাওয়া সম্ভব। জলবায়ু পরিবর্তন, উপকূলীয় ভূমিক্ষয়, লবণাক্ততা, বন ও জলাভূমির পরিবর্তন এবং বঙ্গোপসাগরের মৎস্যসম্পদ ও সামুদ্রিক দূষণ পর্যবেক্ষণেও এর ব্যবহার রয়েছে।
একই সঙ্গে মহাকাশ শিল্পপার্ক গড়ে উঠলে রকেট ও স্যাটেলাইটের পাশাপাশি ইলেকট্রনিকস, সেন্সর, সফটওয়্যার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্য বিশ্লেষণভিত্তিক শিল্প বিকশিত হতে পারে। এসব প্রযুক্তির অনেকগুলো পরবর্তী সময়ে কৃষি, চিকিৎসা, যোগাযোগ, পরিবহন ও অন্যান্য শিল্পেও ব্যবহার করা সম্ভব। ফলে মহাকাশ বিনিয়োগের বড় সুফল আসতে পারে একটি নতুন জ্ঞানভিত্তিক ও উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর অর্থনৈতিক পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত কৌশল হবে ‘ছোট থেকে বড়’ হওয়ার নীতি। প্রথমে গবেষণা, মানবসম্পদ, ছোট স্যাটেলাইট ও পরীক্ষাগার; এরপর স্যাটেলাইট উৎপাদন ও ছোট উৎক্ষেপণযানের প্রযুক্তি; তারপর প্রয়োজন ও সক্ষমতা অনুযায়ী বাণিজ্যিক উৎক্ষেপণ অবকাঠামো। প্রতিটি পর্যায়ের প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক সাফল্য পরবর্তী বিনিয়োগের ভিত্তি হবে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, প্রযুক্তি প্রদর্শন, পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রম—প্রতিটি ধাপে স্বাধীন মূল্যায়ন থাকা প্রয়োজন। এতে ব্যর্থতা ও রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ের ঝুঁকি কমবে।
সরকারি অর্থায়নের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অপরিহার্য। ভারতের শ্রীহরিকোটা দেখিয়েছে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার গুরুত্ব; ব্রাজিলের আলকান্তারা দেখিয়েছে ভৌগোলিক সুবিধাকে বাণিজ্যিক উৎক্ষেপণ বাজারের সঙ্গে যুক্ত করার সম্ভাবনা; দক্ষিণ কোরিয়া দেখিয়েছে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গ্রহণ করেও ধীরে ধীরে নিজস্ব উৎক্ষেপণ প্রযুক্তি গড়ে তোলা যায়। বাংলাদেশের উচিত এই অভিজ্ঞতাগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজস্ব বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মডেল তৈরি করা।
তবে শুরুতেই ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের বড় উৎক্ষেপণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা বাস্তবসম্মত নয়। ছোট গবেষণা, বিশ্ববিদ্যালয় ও পৃথিবী পর্যবেক্ষণ স্যাটেলাইটের উৎক্ষেপণ এবং আঞ্চলিক বাজারে সীমিত সেবা দিয়ে ধীরে ধীরে প্রবেশ করাই যুক্তিযুক্ত। আরও বড় সম্ভাবনা রয়েছে স্যাটেলাইট তথ্যের বাণিজ্যিক ব্যবহারে। কৃষি, মৎস্য, আবহাওয়া, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, বীমা, নগর পরিকল্পনা ও সমুদ্র অর্থনীতিতে এসব তথ্যের ব্যবহার বাড়ানো গেলে উৎক্ষেপণকেন্দ্রের বাইরেও একটি বড় মহাকাশ অর্থনীতি তৈরি হতে পারে।
মহাকাশ কর্মসূচির সঙ্গে ভূরাজনৈতিক ও আইনি বিষয়ও জড়িত। মহাকাশ প্রযুক্তির অনেক উপাদান দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য হওয়ায় বড় কর্মসূচি আন্তর্জাতিক আগ্রহ তৈরি করবে। তাই কোনো একক দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর না করে ভারত, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে প্রয়োজনভিত্তিক বহুমুখী সহযোগিতা গড়ে তোলা বাংলাদেশের জন্য অধিক নিরাপদ। একই সঙ্গে ১৯৬৭ সালের মহাকাশ চুক্তিসহ আন্তর্জাতিক বিধিবিধান, স্যাটেলাইট নিবন্ধন, উৎক্ষেপণজনিত ক্ষতিপূরণ, বীমা, তৃতীয় পক্ষের দায় এবং মহাকাশের ধ্বংসাবশেষ ব্যবস্থাপনার জন্য আধুনিক জাতীয় আইন প্রণয়ন জরুরি।
নিরাপত্তাও হবে অন্যতম প্রধান শর্ত। উৎক্ষেপণ ব্যর্থ হলে জননিরাপত্তা, বিমান চলাচল, সমুদ্রপথ ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই নিরাপদ উৎক্ষেপণ অঞ্চল, বিমান ও নৌ চলাচল নিয়ন্ত্রণ, জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা, বীমা এবং ক্ষতিপূরণের কাঠামো আগে থেকেই নির্ধারণ করতে হবে। প্রযুক্তি আমদানির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও বিবেচনায় নিতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে। পুনর্বাসন, ন্যায্য ক্ষতিপূরণ, কর্মসংস্থান ও পরিবেশ সুরক্ষার মাধ্যমে স্থানীয় মানুষকে প্রকল্পের সুফলের অংশীদার করা জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় মহাকাশ রোডম্যাপ প্রণয়ন। আগামী পাঁচ, দশ ও পনেরো বছরের সুস্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করে প্রথমে গবেষণা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন, এরপর ক্ষুদ্র স্যাটেলাইট, প্রযুক্তি প্রদর্শন ও পরীক্ষাগার, তারপর ছোট উৎক্ষেপণযানের প্রযুক্তি এবং সক্ষমতা প্রমাণিত হলে ধাপে ধাপে বাণিজ্যিক উৎক্ষেপণ অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি পর্যায়ের সাফল্য ও অর্থনৈতিক কার্যকারিতা পরবর্তী বিনিয়োগের ভিত্তি হওয়া উচিত। সরকার গবেষণা, মৌলিক অবকাঠামো, নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তার ভিত্তি তৈরি করবে; আর বেসরকারি খাত স্যাটেলাইট, সফটওয়্যার, যন্ত্রাংশ, তথ্য বিশ্লেষণ, গবেষণা ও বাণিজ্যিক সেবায় বিনিয়োগ করবে। একই সঙ্গে বিজ্ঞান, অর্থনীতি, শিল্প, পররাষ্ট্রনীতি, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিকে সমন্বয় করে একটি শক্তিশালী জাতীয় মহাকাশ কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
বাংলাদেশের এখনই রকেট উৎক্ষেপণের চেয়ে এখনই প্রস্তুতি শুরু করা বেশি জরুরি। প্রযুক্তি, নিরাপত্তা, অর্থনীতি, পরিবেশ ও আন্তর্জাতিক আইনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরই বাণিজ্যিক উৎক্ষেপণে যাওয়া উচিত। বাংলাদেশের মহাকাশযাত্রার মূলনীতি হতে পারে—প্রথমে গবেষণা, তারপর প্রযুক্তি, এরপর পরীক্ষা, তারপর উৎক্ষেপণ এবং সবশেষে বাণিজ্যিকীকরণ। এতে উচ্চাভিলাষের সঙ্গে বাস্তবতার সমন্বয় হবে এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় ও প্রযুক্তিগত ব্যর্থতার ঝুঁকি কমবে।
কুয়াকাটার সম্ভাব্য স্পেসপোর্টের সাফল্য তাই শুধু একটি রকেট সফলভাবে আকাশে উঠল কি না, তা দিয়ে বিচার করা যাবে না। কতজন দক্ষ মহাকাশ প্রকৌশলী ও গবেষক তৈরি হলো, কতটি স্যাটেলাইট দেশ নিজে নকশা ও উৎপাদন করতে পারল, বিদেশি প্রযুক্তিনির্ভরতা কতটা কমল, কতটি উচ্চপ্রযুক্তির শিল্প ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলো এবং কৃষি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পর্যবেক্ষণ, পরিবেশ ও সমুদ্র অর্থনীতিতে মহাকাশ প্রযুক্তি কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হলো—এসবই হবে সাফল্যের প্রকৃত মানদণ্ড।
সেই অর্থে কুয়াকাটার সম্ভাব্য স্পেসপোর্ট কোনো শেষ গন্তব্য নয়; এটি বাংলাদেশের জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি, উচ্চপ্রযুক্তির শিল্প ও ভবিষ্যৎ উদ্ভাবনের নতুন প্রবেশদ্বার হতে পারে। তবে সেই দরজা খুলতে শুধু বিপুল অর্থ বিনিয়োগ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার, বৈজ্ঞানিক ও অর্থনৈতিকভাবে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা, বেসরকারি উদ্যোগ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং একটি নতুন প্রজন্মকে মহাকাশ প্রযুক্তির জন্য প্রস্তুত করার জাতীয় সংকল্প। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের মহাকাশ ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে কত বড় রকেট আমরা তৈরি করতে পারলাম তা দিয়ে নয়; বরং মহাকাশ প্রযুক্তিকে কতটা দক্ষতার সঙ্গে জাতীয় উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও জনকল্যাণের শক্তিতে রূপান্তর করতে পারলাম, তার ওপর।
লেখক: অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট
Mizan12bd@yahoo.com