দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটাতে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ জোরদার করেছে সরকার। এর অংশ হিসেবে পেট্রোবাংলা বাস্তবায়ন করছে ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কর্মসূচি।
পরিকল্পনাটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে ২০৩০ সালের মধ্যে দৈনিক প্রায় এক হাজার ৪০১ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) অতিরিক্ত গ্যাস উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে। এতে আমদানীকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) নির্ভরতা কমার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমবে।
পেট্রোবাংলার হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, দেশে এ পর্যন্ত ২৯.৭৮ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুদ মূল্যায়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে গত ৩০ জুন পর্যন্ত প্রায় ২২.৪১ টিসিএফ গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে।
অবশিষ্ট উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের পরিমাণ প্রায় ৭.৩৭ টিসিএফ। বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ক্রমাগত কমে আসায় ভবিষ্যতে দেশীয় গ্যাস সরবরাহের ওপর চাপ আরো বাড়তে পারে। এ অবস্থায় নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার, পুরনো ক্ষেত্রের গভীর স্তরে অনুসন্ধান এবং দ্রুত উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে দেশে দৈনিক প্রায় দুই হাজার ৬৮৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে।
এর প্রায় ৬৪ শতাংশ আসছে দেশীয় উৎস থেকে। বাকি ৩৬ শতাংশ পূরণ করা হচ্ছে উচ্চমূল্যে আমদানীকৃত এলএনজি দিয়ে। এতে চাপ পড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর।
পেট্রোবাংলার হিসাব বিভাগের তথ্য বলছে, দেশে গ্যাসের বাড়তি চাহিদা পূরণে ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে। ২০১৮-১৯ থেকে ২০২৫-২৬ পর্যন্ত আট অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় দুই লাখ ৭৭ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা বা প্রায় ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। একই সময়ে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হয়েছে ৫১ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এত বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রাখতে সরকারকে বড় অঙ্কের ভর্তুকি বহন করতে হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বেড়ে যাওয়ায় এই চাপ আরো তীব্র হয়ে উঠেছে।
জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কালের কণ্ঠকে বলেন, এই পরিস্থিতিতে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে নেওয়া ১৫০ কূপ কর্মসূচির আওতায় এরই মধ্যে ২৯টি কূপের খননকাজ সফলভাবে শেষ হয়েছে। এসব কূপ থেকে প্রায় ২৭০.৮ মিলিয়ন ঘনফুট নতুন গ্যাসের সংস্থান নিশ্চিত হয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ১২৫.৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে।
এ ছাড়া আটটি কূপে খনন ও ওয়ার্কওভার কার্যক্রম চলছে। এসব কাজ সফলভাবে শেষ হলে জাতীয় গ্রিডে আরো প্রায় ৯০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কর্মসূচির আওতায় বাকি ১১৩টি কূপের অনুসন্ধান, উন্নয়ন ও ওয়ার্কওভার পর্যায়ক্রমে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পেট্রোবাংলার পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১৫০ কূপের পুরো কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে দৈনিক প্রায় এক হাজার ৪০১ মিলিয়ন ঘনফুট অতিরিক্ত গ্যাস উৎপাদন সম্ভব হবে। এতে জাতীয় গ্যাস সরবরাহে দেশীয় উৎসর অংশ বাড়বে এবং এলএনজি আমদানির প্রয়োজনীয়তা কিছুটা কমবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার পরিচালক (পিএসসি এবং অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. শোয়েব কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে সরকার ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কর্মসূচি বাস্তবায়নের পাশাপাশি নতুন গ্যাসের সন্ধানে ব্যাপক অনুসন্ধান কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্র ও ব্লকে সাইসমিক ডেটা সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে নতুন লিড ও খননযোগ্য প্রসপেক্ট শনাক্ত করা হচ্ছে। এসব সম্ভাবনাময় এলাকায় দ্রুত অনুসন্ধান কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনায় অনশোরে (স্থলভাগে) নতুন সম্ভাবনাময় ভূতাত্ত্বিক কাঠামো চিহ্নিত করে দ্রুত অনুসন্ধান কূপ খননের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন বাড়াতে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার, আধুনিক সাইসমিক জরিপ, সাবসারফেস মডেলিং এবং আধুনিক ড্রিলিং প্রযুক্তি প্রয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। দক্ষ জনবল তৈরি ও আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।’
মো. শোয়েব বলেন, ‘নতুন গ্যাসের সন্ধানে চরফ্যাশনে বাপেক্সের মাধ্যমে ৬৬০ বর্গকিলোমিটার থ্রিডি সাইসমিক জরিপ প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি হবিগঞ্জ ও বাখরাবাদ এলাকায় প্রায় এক হাজার ৪৫০ বর্গকিলোমিটারজুড়ে টুডি সাইসমিক জরিপের কাজ চলছে। একই এলাকায় ২৫৫ লাইন কিলোমিটার টুডি এবং ৬৩২ বর্গকিলোমিটার থ্রিডি করারও পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।
জামালপুর-১-এ গ্যাস প্রাপ্তির পরিপ্রেক্ষিতে ওই এলাকায় ৪৬০ বর্গকিলোমিটার থ্রিডি সাইসমিক জরিপের জন্য প্রকল্প প্রণয়নের কাজ করছে বাপেক্স। সিলেটের লামিগাঁও, লালাবাজার, দোয়ারাবাজার সাউথ, রশিদপুর সাউথ এলাকায়ও অনুসন্ধানের জন্য ৮৮২ বর্গকিলোমিটার থ্রিডি সাইসমিক জরিপের একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘শুধু সাইসমিক জরিপের মধ্যেই কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখা হবে না। জরিপে সম্ভাবনাময় ভূতাত্ত্বিক কাঠামো শনাক্ত হওয়ার পর সেসব এলাকায় অনুসন্ধান কূপ খনন করা হবে। অর্থাৎ সাইসমিক জরিপ, ভূতাত্ত্বিক কাঠামো শনাক্তকরণ এবং কূপ খনন-এই তিনটি কার্যক্রমকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিয়ে দেশীয় গ্যাসের নতুন উৎস আবিষ্কার ও উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’
এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (আইইউবি) উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, ‘দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো এখন ক্রমহ্রাসমান (ডিক্লাইনিং) পর্যায়ে রয়েছে। এসব গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন ধরে রাখতে প্রয়োজন উন্নত প্রযুক্তি, অভিজ্ঞতা ও বড় বিনিয়োগ, যা বাপেক্সের পর্যাপ্ত নেই। তাই শুধু বাপেক্সের ওপর নির্ভর না করে শেভরনের মতো অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তি, জ্ঞান ও বিনিয়োগ কাজে লাগানোর বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।’
তিনি বলেন, ‘১৫০টি কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হলেও দেখা যাচ্ছে একদিকে নতুন করে গ্যাসের উৎপাদন বাড়লেও অন্যদিকে আবার উৎপাদন কমে যাচ্ছে। অর্থাৎ কূপ খননের পাশাপাশি গ্যাসক্ষেত্রের স্বাভাবিক উৎপাদন হ্রাস ঠেকানোও জরুরি। গ্যাসক্ষেত্রের ওপরের ছোট ছোট গ্যাস স্তর বা থিন বেডগুলো সম্পন্ন করে উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।’
ছাতক গ্যাসক্ষেত্রের বিষয়ে ম. তামিম বলেন, ‘প্রাথমিক হিসাবে সেখানে ৬০০ বিলিয়ন থেকে এক ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের মজুদের সম্ভাবনা রয়েছে। এটি কম গভীরতার ঝুঁকিপূর্ণ রিজার্ভ হলেও সতর্কতার সঙ্গে উন্নয়ন করা গেলে সেখান থেকে দৈনিক প্রায় ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন সম্ভব হতে পারে। আগামী বছর গ্যাসসংকট সামাল দিতে এ ধরনের সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র দ্রুত কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।’
পেট্রোবাংলার গ্যাস সরবরাহের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত ছয় বছরে দেশীয় গ্যাসের দৈনিক উৎপাদন দুই হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে বর্তমানে প্রায় এক হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমেছে। অন্যদিকে এই সময়ে বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে গ্যাসের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ফলে এই ঘাটতি পূরণে নিয়মিতভাবে স্পট মার্কেট ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে। তবে এলএনজি দেশীয় গ্যাসের তুলনায় কয়েক গুণ ব্যয়বহুল হওয়ায় গ্যাস সরবরাহের সামগ্রিক ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বর্তমানে দেশে গ্যাসের মোট চাহিদা প্রায় চার হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। গতকাল রবিবার জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয় দুই হাজার ৩৯৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। এর মধ্যে ৭৯২ মিলিয়ন ঘনফুট এসেছে এলএনজি থেকে। গতকাল এক হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো ঘাটতি ছিল।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো না গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়ে হবে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ। তখন এলএনজির ব্যয় সামাল দেওয়া বাংলাদেশের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।
সূত্র: কালের কণ্ঠ