প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, দেশে সনদনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে দক্ষতাভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অটোমেশনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রচলিত শিক্ষা কারিকুলামকে আধুনিক ও বাস্তবভিত্তিক করার বিকল্প নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন।
রোববার সকালে রাজধানীর বাংলাদেশ চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত ‘কর্মমুখী ও টেকনিক্যাল শিক্ষা বিষয়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ’ কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময়ের শাসনব্যবস্থা শুধু দেশের গণতান্ত্রিক অধিকার ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করেনি, শিক্ষাব্যবস্থাকেও গভীর সংকটে ফেলেছে। গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে এখন শিক্ষা খাতকে পুনর্গঠন করে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের সময় এসেছে।
তিনি বলেন, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গবেষণায় নতুন প্রজন্মকে দক্ষ করে তুলতে হবে। দেশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার রক্ষায় যারা আত্মত্যাগ করেছেন, তাঁদের অবদানকে সম্মান জানাতে হলে জাতিকে জ্ঞান ও দক্ষতায় সমৃদ্ধ হতে হবে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের দুই হাজারের বেশি অধিভুক্ত কলেজে বর্তমানে ৪০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। উচ্চশিক্ষার সুযোগ বিস্তারে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তিনি উল্লেখ করেন, সবার জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে ১৯৯২ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এআই ও অটোমেশনভিত্তিক প্রযুক্তির কারণে অনেক প্রচলিত পেশা ঝুঁকির মুখে পড়লেও একই সঙ্গে নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। এই বাস্তবতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার সিকিউরিটি, প্রোগ্রামিং, ডিজিটাল এন্টারপ্রেনারশিপ, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, ন্যানো টেকনোলজি এবং ফাইভ জি প্রযুক্তির মতো বিষয় শিক্ষা কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
তিনি জানান, বর্তমান সরকার প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত শিক্ষাক্রমকে বাস্তবভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করার কাজ শুরু করেছে। শিক্ষার্থীরা যাতে শুধু সনদ অর্জন না করে, বরং কর্মক্ষেত্রের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারে, সে লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে।
উচ্চশিক্ষিত বেকারত্ব কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সর্বোচ্চ একাডেমিক সনদ অর্জনের পরও প্রায়োগিক দক্ষতার অভাবে অনেক তরুণ বেকার থাকছেন। এ পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে সরকার এপ্রেন্টিসশিপ, ইন্টার্নশিপ এবং ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সহযোগিতা বাড়ানোর পদক্ষেপ নিচ্ছে। প্রাথমিকভাবে বিভাগীয় শহরগুলোতে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে সরকারের উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় থেকে উদ্ভাবনী ব্যবসায়িক ধারণা বাণিজ্যিকীকরণের লক্ষ্যে প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় ‘সিড ফান্ডিং’ বা ‘ইনোভেশন গ্র্যান্ট’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে তরুণরা শুধু চাকরির পেছনে না ছুটে নিজেরাই কর্মসংস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।
প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একজন মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে নৈতিক শিক্ষার বিকল্প নেই। দক্ষতা ও আধুনিকায়নের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ে আরও মনোযোগী হতে হবে।
তিনি বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় ভাষা শেখার ওপরও গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, অতিরিক্ত ভাষাজ্ঞান দেশে ও বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে সহায়ক হবে।
শিক্ষকদের সমাজ পরিবর্তনের অগ্রদূত ও রোল মডেল হিসেবে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের ছাত্র ও যুবশক্তিকে প্রযুক্তিতে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা গেলে সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ বিশ্বের সামনে একটি রোল মডেল হয়ে উঠবে।
অনুষ্ঠানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এ এস এম আমানুল্লাহ সভাপতিত্ব করেন। এতে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন, শিক্ষা সচিব আবদুল খালেক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মো. লুৎফর রহমান বক্তব্য রাখেন।