রাজধানী ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ লাইনস বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের ইতিহাসে শুধু একটি স্থান নয়; এটি একটি প্রতীক, একটি স্মৃতি, একটি রক্তমাখা অঙ্গীকার। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে পশ্চিম পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে নিরস্ত্র বাঙালি জাতির ওপর ইতিহাসের এক নৃশংসতম সামরিক অভিযান শুরু করে, তখন ঢাকার বুকেই প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে রাজারবাগ পুলিশ লাইনস। সেখানে অবস্থানরত পুলিশ সদস্যরা জানতেন তাঁদের অস্ত্র সীমিত, প্রস্তুতি অসম্পূর্ণ, প্রতিপক্ষ সুসজ্জিত ও সংখ্যায় প্রবল। তবু তাঁরা আত্মসমর্পণ করেননি। তাঁরা প্রতিরোধ করেছিলেন। তাঁরা প্রমাণ করেছিলেন রাষ্ট্রের পোশাক পরা একজন বাঙালি পুলিশ সদস্য কেবল সরকারি কর্মচারী নন; তিনি জনগণের নিরাপত্তারক্ষী, স্বাধীনতার প্রহরী এবং জাতির সংকটমুহূর্তে এক সাহসী যোদ্ধা।
এই সেই ঐতিহাসিক রাজারবাগ পুলিশ লাইনস, যেখানে ২৫ মার্চ রাতে ঘুমন্ত পুলিশ সদস্যদের ওপর হানাদার বাহিনী বর্বর আক্রমণ চালিয়েছিল। কিন্তু সেই আক্রমণ শুধু একটি পুলিশ ব্যারাকের ওপর হামলা ছিল না; এটি ছিল বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়, অধিকারবোধ এবং স্বাধীনতার আকাক্সক্ষার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ভেবেছিল, রাতের অন্ধকারে আকস্মিক সামরিক আঘাতে বাঙালির প্রতিরোধশক্তি ভেঙে দেওয়া যাবে। কিন্তু ইতিহাস প্রমাণ করেছে জাতির মুক্তির আকাক্সক্ষা একবার জেগে উঠলে তাকে বন্দুকের নল দিয়ে স্থায়ীভাবে স্তব্ধ করা যায় না। রাজারবাগে পুলিশ সদস্যদের প্রতিরোধ সেই অমোঘ সত্যেরই প্রথম দীপ্ত ঘোষণা।
রাজারবাগের মাটিতে দাঁড়ালে তাই শুধু শহীদদের কথা মনে পড়ে না; মনে পড়ে রাষ্ট্র ও জনগণের সম্পর্কের মৌলিক প্রশ্নও। পুলিশ কাদের? রাষ্ট্রের? সরকারের? নাকি জনগণের? স্বাধীনতার প্রথম প্রহরে রাজারবাগের পুলিশ সদস্যরা এই প্রশ্নের উত্তর তাঁদের রক্ত দিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁরা প্রমাণ করেছিলেন- পুলিশ বাহিনীর প্রকৃত আনুগত্য জনগণের প্রতি, দেশের প্রতি, স্বাধীনতার প্রতি। কোনো স্বৈরশাসক, কোনো ফ্যাসিবাদী শক্তি, কোনো অবৈধ ক্ষমতাকাঠামো যদি কখনো পুলিশকে জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে চায়, তবে রাজারবাগের ইতিহাস সেই অপচেষ্টার বিরুদ্ধে এক চিরন্তন সতর্কবার্তা হয়ে থাকবে।
আজ স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের পবিত্র দায়িত্ব হলো, যেকোনো মূল্যে সেই স্বাধীনতা রক্ষা করা। স্বাধীনতা শুধু এক দিনের বিজয় নয়; এটি প্রতি দিনের দায়িত্ব। স্বাধীনতা শুধু একটি পতাকা নয়; এটি ন্যায়, মর্যাদা, জনগণের অধিকার, রাষ্ট্রের জবাবদিহি এবং মানুষের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। যে স্বাধীনতার জন্য রাজারবাগে পুলিশ সদস্যরা প্রাণ দিয়েছিলেন, যে স্বাধীনতার পক্ষে চট্টগ্রামে মেজর জিয়াউর রহমান ‘উই রিভোল্ট’ উচ্চারণ করেছিলেন, সেই স্বাধীনতাকে কোনোভাবেই জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত রাষ্ট্রযন্ত্রে পরিণত হতে দেওয়া যায় না। এই বাংলাদেশে আর কোনো ফ্যাসিবাদী বা স্বৈরাচারী শক্তি যেন পুলিশ সদস্যদের দেশ ও জনগণের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে না পারে, এটাই আজকের জাতীয় শপথ হওয়া উচিত।
১৯৭১ সালের মার্চ ছিল বিস্ফোরণের অপেক্ষায় থাকা এক উত্তাল সময়। একদিকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর প্রতারণা, অন্যদিকে বাঙালি জনগণের ক্রমবর্ধমান স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা। রাজপথে মানুষ, ঘরে ঘরে উত্তেজনা, রাজনৈতিক আলোচনার আড়ালে সামরিক প্রস্তুতি- সব মিলিয়ে পূর্ব বাংলা তখন ইতিহাসের এক মোড়ে দাঁড়িয়ে। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে প্রতিদিন সৈন্য আনা হচ্ছিল, সামরিক শক্তি বাড়ানো হচ্ছিল, ঢাকাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পাকিস্তানি বাহিনী নিজেদের অবস্থান সুসংহত করছিল। সাধারণ মানুষও অনুভব করছিল, কোনো বড় সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে উঠছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এ অবস্থায় রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে এত পুলিশ সদস্যকে একসঙ্গে জড়ো করে রাখার পেছনে কী যুক্তি ছিল? এটি কি প্রশাসনিক স্বাভাবিকতা ছিল, নাকি রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা? এটি কি প্রতিরোধের প্রস্তুতি ছিল, নাকি সম্ভাব্য আক্রমণের ঝুঁকিকে অবমূল্যায়ন করা হয়েছিল?
এই প্রশ্ন আজও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ইতিহাস শুধু আবেগের বিষয় নয়; ইতিহাস বিশ্লেষণের বিষয়ও। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আমাদের গর্বের ইতিহাস, কিন্তু সেই ইতিহাসের ভিতরেও কৌশলগত প্রশ্ন, নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত, সামরিক প্রস্তুতি, প্রশাসনিক অবস্থান এবং সম্ভাব্য ভুল মূল্যায়নের বিষয়গুলো গবেষণার দাবি রাখে। যারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করেন, তাঁদের জন্য রাজারবাগের ঘটনাপ্রবাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানের ক্ষেত্র। ২৫ মার্চের আগে যে পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছিল, তাতে পুলিশ বাহিনীকে কীভাবে সংগঠিত করা হয়েছিল, তাদের সম্ভাব্য ভূমিকা কী হিসেবে বিবেচিত ছিল, তাদের নিরাপত্তা বা প্রতিরোধক্ষমতা নিয়ে কী পরিকল্পনা ছিল, এসব প্রশ্নের গভীর অনুসন্ধান প্রয়োজন। তবে প্রশ্ন তোলা মানে শহীদদের আত্মত্যাগকে খাটো করা নয়। বরং প্রশ্ন তোলার মধ্য দিয়েই তাঁদের আত্মত্যাগের বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়। যদি রাজারবাগের পুলিশ সদস্যরা রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে প্রতিকূল অবস্থায় থেকেও প্রতিরোধ করে থাকেন, তবে তাঁদের সাহস আরও বড় হয়ে ওঠে। যদি তাঁদের যথাযথ প্রস্তুতি বা সমর্থন না থেকেও তাঁরা লড়ে থাকেন, তবে তাঁদের আত্মত্যাগ আরও মহিমান্বিত হয়। ইতিহাসের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা হলো শুধু স্মরণ নয়, বোঝার চেষ্টা করা; শুধু ফুল দেওয়া নয়, শিক্ষা গ্রহণ করা।
রাজারবাগের প্রতিরোধ এবং চট্টগ্রামে মেজর জিয়াউর রহমানের ‘উই রিভোল্ট’ এই দুই ঘটনাকে আলাদা করে দেখা যায় না। একদিকে ঢাকার কেন্দ্রে রাজারবাগের পুলিশ সদস্যদের মরণপণ প্রতিরোধ, অন্যদিকে চট্টগ্রামে বাঙালি সামরিক অফিসারের বিদ্রোহী ঘোষণা- এই দুই স্ফুলিঙ্গই মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক মানসিক ও সামরিক ভিত্তিকে দৃঢ় করে। রাজারবাগ দেখিয়েছিল, বাঙালি পুলিশ জনগণের পক্ষে দাঁড়াতে পারে। চট্টগ্রাম দেখিয়েছিল, বাঙালি সেনা অফিসারও পাকিস্তানি সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিতে পারে। এরপর স্বাধীনতার লড়াই থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষের পিছিয়ে থাকার আর কোনো সুযোগ ছিল না।
এই দুই প্রতিরোধ একসঙ্গে একটি জাতীয় বার্তা দিয়েছিল- বাঙালি আর শাসিত জাতি হিসেবে থাকতে রাজি নয়। বাঙালি আর অন্যায়ের কাছে মাথা নত করবে না। পাকিস্তানি রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে সমঅধিকার, গণতন্ত্র ও মর্যাদার আশা ভেঙে যাওয়ার পর স্বাধীনতাই ছিল একমাত্র পথ। রাজারবাগের গুলির শব্দ, চট্টগ্রামের বিদ্রোহী ঘোষণা, গ্রামগঞ্জে মানুষের সংগঠিত প্রতিরোধ- সব মিলিয়ে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ আর কোনো বিচ্ছিন্ন সামরিক সংঘর্ষ ছিল না; এটি হয়ে উঠেছিল জাতির অস্তিত্বরক্ষার যুদ্ধ।
মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রজন্ম এই ইতিহাসকে দেখেছে, অনুভব করেছে, বেঁচে থেকেছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এই ইতিহাস এসেছে বইয়ের পাতা, স্মৃতিকথা, দলিল, গবেষণা, চলচ্চিত্র, পারিবারিক স্মৃতি এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। আমরা যারা পরবর্তী প্রজন্ম, আমাদের কাছে মুক্তিযুদ্ধ একই সঙ্গে গৌরব, দায়িত্ব এবং অনুসন্ধানের বিষয়। আমরা শহীদদের সম্মান করি, মুক্তিযোদ্ধাদের কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি, কিন্তু একই সঙ্গে ইতিহাসের বহু অনুত্তরিত প্রশ্ন নিয়ে ভাবি। কারণ একটি জাতি যত পরিণত হয়, তার ইতিহাসচর্চাও তত গভীর হয়।
রাজারবাগের ঘটনাকে তাই শুধু আবেগে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। এর মধ্যে রাষ্ট্রচিন্তার শিক্ষা আছে। পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা সম্পর্কে শিক্ষা আছে। সংকটকালীন নিরাপত্তা পরিকল্পনার শিক্ষা আছে। জনগণের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সম্পর্ক নিয়ে শিক্ষা আছে। সবচেয়ে বড় কথা, ক্ষমতার প্রতি নয়- দেশের প্রতি আনুগত্যের শিক্ষা আছে। যে পুলিশ সদস্যরা ২৫ মার্চ রাতে প্রতিরোধ করেছিলেন, তাঁরা কোনো ব্যক্তির ক্ষমতা রক্ষার জন্য লড়েননি; তাঁরা জাতির মর্যাদা রক্ষার জন্য লড়েছিলেন। এটাই তাঁদের মহত্ত্ব। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ বহু রাজনৈতিক উত্থানপতনের মধ্য দিয়ে গেছে। বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বার্থে ব্যবহার করার চেষ্টা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও কখনো কখনো রাজনৈতিক ক্ষমতার বলয়ে টেনে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু রাজারবাগের ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় পুলিশ বাহিনীর পবিত্রতা নষ্ট হলে রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়। পুলিশ যদি জনগণের আস্থা হারায়, তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শক্তিশালী হলেও রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে পড়ে। আর পুলিশ যদি জনগণের পাশে দাঁড়ায়, তবে রাষ্ট্রের ভিত শক্তিশালী হয়। এই কারণেই রাজারবাগের স্মৃতি শুধু অতীতের স্মৃতি নয়; এটি বর্তমানেরও নির্দেশনা। আজকের বাংলাদেশে পুলিশ বাহিনীর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জনগণের আস্থা পুনর্গঠন, পেশাদারত্ব বজায় রাখা, আইনের শাসনের প্রতি অবিচল থাকা এবং কোনো রাজনৈতিক শক্তির হাতিয়ার না হওয়া। পুলিশ সদস্যরা রাষ্ট্রের কর্মচারী হলেও তাঁদের নৈতিক অবস্থান জনগণের নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের দায়িত্ব অপরাধ দমন করা, শৃঙ্খলা রক্ষা করা, নাগরিক অধিকার সুরক্ষা করার কোনো অন্যায় ক্ষমতার প্রহরী হওয়া নয়। রাজারবাগের শহীদরা আমাদের শিখিয়েছেন, ইউনিফর্মের মর্যাদা আসে জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে। অস্ত্রের মর্যাদা আসে ন্যায়ের পক্ষে ব্যবহৃত হলে। রাষ্ট্রের শক্তি তখনই বৈধ, যখন তা জনগণের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তারক্ষায় ব্যবহৃত হয়। যে শক্তি জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়, তা কখনো স্থায়ী নৈতিক শক্তি হতে পারে না। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী অস্ত্রশক্তিতে প্রবল ছিল, কিন্তু নৈতিকতায় পরাজিত। রাজারবাগের পুলিশ সদস্যরা অস্ত্রে দুর্বল ছিলেন, কিন্তু নৈতিকতায় বিজয়ী। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত নৈতিক শক্তিকেই সম্মান করে। এই লেখার কেন্দ্রীয় ভাবনা তাই তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমত রাজারবাগের প্রতিরোধ বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের এক অবিচ্ছেদ্য সূচনা-অধ্যায়। দ্বিতীয়ত চট্টগ্রামে মেজর জিয়ার উই রিভোল্ট এবং রাজারবাগের পুলিশ প্রতিরোধ একসঙ্গে জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের পথে অপ্রতিরোধ্য করে তোলে। তৃতীয়ত স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থায় পুলিশসহ সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জনগণের স্বাধীনতার রক্ষক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, কোনো স্বৈরাচারী শক্তির হাতিয়ার হিসেবে নয়।
রাজারবাগের রক্তাক্ত প্রহর আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা কখনো বিনা মূল্যে আসে না। স্বাধীনতার জন্য জীবন দিতে হয়, সাহস দেখাতে হয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়। কিন্তু স্বাধীনতা অর্জনের পর সেটিকে রক্ষা করাও সমান কঠিন। স্বাধীনতার শত্রু সব সময় বাইরের বাহিনী হয়ে আসে না; কখনো তা আসে অভ্যন্তরীণ ক্ষমতালোভ, দমননীতি, বিচারহীনতা, প্রতিষ্ঠান ধ্বংস, দুর্নীতি এবং জনগণের কণ্ঠরোধের মাধ্যমে। তাই স্বাধীনতা রক্ষার অর্থ শুধু সীমান্ত রক্ষা নয়; গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবিক মর্যাদা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা রক্ষা করাও স্বাধীনতা রক্ষার অংশ।
আজ যখন আমরা রাজারবাগের কথা বলি, তখন শুধু ২৫ মার্চের শহীদদের স্মরণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। আমাদের ভাবতে হবে- আজকের পুলিশ বাহিনী কি সেই ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারের মর্যাদা রক্ষা করছে? রাষ্ট্র কি পুলিশকে পেশাদার ও জনগণমুখী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলছে? রাজনৈতিক নেতৃত্ব কি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখতে প্রস্তুত? জনগণ কি পুলিশকে ভয়ের নয়, আস্থার প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে পারছে? এসব প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে রাজারবাগের আত্মত্যাগ আমরা সত্যিকারে ধারণ করেছি কি না।
এই প্রেক্ষাপটে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসচর্চায় গবেষণাভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত জরুরি। ১৯৭১ সালের মার্চে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত, সামরিক পরিস্থিতি, প্রশাসনিক প্রস্তুতি, পুলিশ বাহিনীর অবস্থান, ইপিআর ও বাঙালি সামরিক কর্মকর্তাদের মনোভাব, পাকিস্তানি বাহিনীর গতিবিধি- সবকিছু মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ দরকার। ইতিহাসের কিছু প্রশ্ন অস্বস্তিকর হতে পারে, কিন্তু জাতীয় পরিপক্বতার জন্য সেগুলো এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। রাজারবাগে পুলিশ সদস্যদের একত্রে রাখার পেছনে কী পরিকল্পনা ছিল- প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করলে মুক্তিযুদ্ধের কৌশলগত বাস্তবতা আরও পরিষ্কার হবে।
তবে এই অনুসন্ধান অবশ্যই শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। ইতিহাস নিয়ে গবেষণা কখনো বিদ্বেষের ভাষায় হওয়া উচিত নয়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কোনো দলীয় সম্পত্তি নয়; এটি জাতির ইতিহাস। রাজারবাগের শহীদ, চট্টগ্রামের বিদ্রোহ, সীমান্তের যুদ্ধ, গ্রামবাংলার প্রতিরোধ- সব মিলিয়ে মুক্তিযুদ্ধ হলো সমগ্র জাতির আত্মত্যাগের ফল। তাই এই ইতিহাসকে সংকীর্ণ দলীয় ব্যাখ্যার মধ্যে আটকে রাখলে আমরা জাতির প্রতি অন্যায় করব। বরং প্রয়োজন হলো দলিলভিত্তিক, যুক্তিনিষ্ঠ, সম্মানজনক এবং জাতীয় স্বার্থনির্ভর ইতিহাসচর্চা।
রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের প্রতিরোধ আমাদের আরও একটি শিক্ষা দেয়- জাতির সংকটে সাধারণ কর্তব্যও অসাধারণ হয়ে ওঠে। একজন পুলিশ সদস্যের দৈনন্দিন কাজ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা। কিন্তু ২৫ মার্চের রাতে তাঁদের সামনে দাঁড়িয়েছিল জাতীয় অস্তিত্বের প্রশ্ন। তাঁরা বুঝেছিলেন, এটি আর সাধারণ দায়িত্ব নয়; এটি মাতৃভূমির প্রতি চূড়ান্ত অঙ্গীকারের মুহূর্ত। সেই অঙ্গীকারের কারণেই তাঁদের প্রতিরোধ আজও জাতীয় স্মৃতিতে অমর।
চট্টগ্রামে মেজর জিয়ার উই রিভোল্ট উচ্চারণও একইভাবে জাতীয় প্রতিরোধের ভাষা হয়ে ওঠে। একজন বাঙালি সামরিক অফিসারের মুখে এই ঘোষণা ছিল পাকিস্তানি সামরিক কাঠামোর বিরুদ্ধে সরাসরি বিদ্রোহের প্রতীক। এটি শুধু সামরিক সিদ্ধান্ত ছিল না; এটি জাতীয় আত্মমর্যাদার ঘোষণা। রাজারবাগের প্রতিরোধ এবং চট্টগ্রামের বিদ্রোহ মিলে বাঙালি জাতিকে জানিয়ে দেয়- প্রতিরোধ শুরু হয়েছে, স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরু হয়েছে, আর ফিরে যাওয়ার পথ নেই।
এই দুই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সম্মিলিত তাৎপর্য হলো- স্বাধীনতা কোনো একক ব্যক্তি, একক প্রতিষ্ঠান বা একক শহরের অর্জন নয়। এটি জাতীয় জাগরণের ফল। পুলিশ, সেনা, ইপিআর, ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, বুদ্ধিজীবী, নারী, যুবক- সবাই মিলে মুক্তিযুদ্ধকে জনযুদ্ধে রূপ দিয়েছিল। কিন্তু রাজারবাগ এবং চট্টগ্রামের ঘটনাগুলো সেই জনযুদ্ধের প্রাথমিক সশস্ত্র মানসিকতা গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখে। এগুলো ছিল প্রতিরোধের সংকেত, আত্মসমর্পণ না করার ঘোষণা। আজকের বাংলাদেশে এই ইতিহাসের প্রাসঙ্গিকতা গভীর। কারণ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে যদি জনগণের আস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়, তবে স্বাধীনতার প্রকৃত চেতনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পুলিশ বাহিনীকে যদি ক্ষমতার রক্ষী বানানো হয়, তবে রাজারবাগের আত্মত্যাগ অপমানিত হয়। আবার পুলিশ বাহিনীকে যদি পেশাদার, মানবিক, আইননিষ্ঠ এবং জনগণমুখী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা যায়, তবে রাজারবাগের উত্তরাধিকার সত্যিকার অর্থে জীবিত থাকে।
সুতরাং আমাদের জাতীয় শপথ হওয়া উচিত এই দেশে আর কোনো স্বৈরাচারী শক্তি যেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জনগণের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে না পারে। পুলিশ যেন জনগণের বন্ধু হয়, ভয়ের প্রতীক নয়। রাষ্ট্র যেন নাগরিকের মর্যাদাকে সম্মান করে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যেন প্রতিষ্ঠানকে দলীয় দাসত্বে পরিণত না করে। আর জনগণ যেন ইতিহাসের শিক্ষা ভুলে না যায়।
রাজারবাগের মাটি আমাদের ডাকে। সেই ডাক স্মৃতির ডাক, সতর্কতার ডাক, দায়িত্বের ডাক। ২৫ মার্চের রাত আমাদের শেখায় অন্ধকার যত গভীরই হোক, প্রতিরোধের আগুন জ্বলে উঠতে পারে। চট্টগ্রামের উই রিভোল্ট আমাদের শেখায়- দাসত্বের শৃঙ্খল ভাঙার মুহূর্ত এলে সাহসী ঘোষণা ইতিহাস বদলে দিতে পারে। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের শেখায়- একটি জাতি যখন স্বাধীনতার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হয়, তখন তাকে পরাজিত করা যায় না। আজ সেই ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের বলতে হবে, আমরা স্বাধীনতা রক্ষা করব। আমরা শহীদদের আত্মত্যাগ ভুলব না। আমরা রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে জনগণের বিরুদ্ধে নয়, জনগণের সেবায় দেখতে চাই। আমরা পুলিশ বাহিনীকে রাজারবাগের ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে দেখতে চাই। আমরা চাই না কোনো ফ্যাসিবাদ, কোনো স্বৈরাচার, কোনো অন্যায় ক্ষমতালিপ্সা আবার এই বাহিনীকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করাক। রাজারবাগ তাই শুধু অতীত নয়; রাজারবাগ ভবিষ্যতেরও দিশা। চট্টগ্রামের বিদ্রোহ শুধু ইতিহাস নয়; সেটি জাতীয় সাহসের চিরন্তন প্রতীক। আর স্বাধীনতা শুধু অর্জিত সম্পদ নয়; এটি রক্ষার অঙ্গীকার। সেই অঙ্গীকারের নামই বাংলাদেশ। সেই অঙ্গীকারের ভিতরেই রাজারবাগের শহীদ পুলিশ সদস্যদের আত্মা বেঁচে থাকবে, মেজর জিয়ার উই রিভোল্ট ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হবে এবং স্বাধীনতাকামী মানুষের সংগ্রাম নতুন প্রজন্মকে পথ দেখাবে।
♦️ লেখক : মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা