ভারতের পশ্চিমবঙ্গে রাজধানী কলকাতার উত্তর অঞ্চলের কাশীপুর-বেলগাছিয়া এলাকার অন্তর্গত চিতপুরের জ্যোতিনগর কলোনিতে চরম মানবিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে। প্রায় সাড়ে তিন মাস ধরে (নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে গত মে মাসের শেষ থেকে এবং সার্বিকভাবে জুলাইয়ের শেষভাগ থেকে) সুপেয় পানির সরবরাহ বন্ধ থাকায় চরম দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছেন এই বস্তির প্রায় ৫ হাজার বাসিন্দা, যাদের সিংহভাগই মুসলিম।
সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়্যার ও অল্ট নিউজ-এর সরেজমিন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, কলোনির বাসিন্দাদের দৈনন্দিন বেঁচে থাকার মৌলিক চাহিদা ‘পানি’ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ায় সৃষ্টি হয়েছে তীব্র স্বাস্থ্য ও সামাজিক সংকট।
অবরুদ্ধ কলোনি ও বৈষম্যের চিত্র:
জ্যোতিনগর কলোনিতে মোট পাঁচটি সরকারি ট্যাপ ছিল, যা থেকে দীর্ঘ দিন ধরে স্থানীয় অধিবাসীরা পানি পেয়ে আসছিলেন। তবে গত ২৬ থেকে ২৮ জুলাই কলকাতা পৌরসভা (KMC) কর্তৃক ‘পাইপলাইন মেরামতের’ কথা বলে কলোনির দুই প্রান্তে গর্ত খোড়া হয়। এর পরপরই ২৮ জুলাই রাত ১১টার পর থেকে পানি সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বস্তিটির মাত্র ২০০ থেকে ৫০০ মিটার দূরত্বে অবস্থিত অ-মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে পানির পাইপলাইন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও সচল রয়েছে। এমনকি কলোনির ঠিক বাইরের ট্যাপগুলোতেও নিয়মিত পানি আসছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে কেবল তাদের অংশটুকুর সংযোগ কেটে দিয়ে এলাকা থেকে উচ্ছেদের পাঁচতারা ছক কষা হচ্ছে।
দূষিত গঙ্গার পানি ও লাশের গোসল: মানবেতর জীবনযাপন
পানির তীব্র সংকটে পড়ে কলোনির শিশু ও বৃদ্ধ সহ সাধারণ মানুষ নিরুপায় হয়ে পাশের নোংরা ও দূষিত গঙ্গা নদীর পানি ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন।
স্বাস্থ্য ঝুঁকি: গঙ্গার ময়লা ও দূষিত পানিতে গোসল করার ফলে কলোনির ছোট ছোট শিশুদের শরীরে লাল চাকা চাকা দাগ ও চর্মরোগ দেখা দিচ্ছে।
মানবিক অধিকার লঙ্ঘন: সুপেয় পানির অভাবে এমনকি কলোনিতে কেউ মারা গেলে তার গোসল এবং শেষকৃত্য সম্পন্ন করার জন্য এই দূষিত নদী বা দূর থেকে কিনে আনা পানিই একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ওজু ও ইবাদতে বাধা: স্থানীয় জামে মসজিদে ওজুর পানি বন্ধ থাকায় ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা ইবাদতে চরম সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন।
রাজনৈতিক বক্তব্য ও বিদ্বেষের অভিযোগ:
বাসিন্দাদের একাংশ এই সংকটের পেছনে সরাসরি রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক প্রতিহিংসার অভিযোগ তুলেছেন। স্থানীয় বিজেপি বিধায়ক (MLA) রীতেশ তিওয়ারির নির্বাচনের পরপর দেওয়া একটি বিতর্কিত মন্তব্যকে ঘিরে এই অসন্তোষ তীব্র আকার ধারণ করে। ওই ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা গিয়েছিল—তিনি আগামী পাঁচ বছর তার নির্বাচনি এলাকার কোনো সংখ্যালঘুর জন্য কোনো কাজ করবেন না।
কলোনির ভুক্তভোগী নারীরা সহায়তা চাইতে গেলে বিধায়ক তাদের সাথে বাজে ব্যবহার করেন এবং তাদের নাগরিক সুবিধা দিতে অস্বীকৃতি জানান বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিধায়কের দাবি, জমিটি কোলকাতা পোর্ট ট্রাস্টের (Syama Prasad Mookerjee Port) অধীন এবং সেখানে তারা বেআইনিভাবে বসবাস করছেন।
আইনি জটিলতা ও প্রশাসনিক নীরবতা:
শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি পোর্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে পাবলিক প্রিমাইসেস অ্যাক্ট অনুযায়ী বাসিন্দাদের জমি খালি করার নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। এর বিরুদ্ধে স্থানীয় অধিবাসীরা ও অধিকার রক্ষা সংস্থাগুলো হাইকোর্টের শরণাপন্ন হলে কলকাতা হাইকোর্ট প্রাথমিকভাবে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তাদের উচ্ছেদের ওপর মধ্যবর্তী স্থগিতাদেশ (Interim Protection) জারি করে।
তবে আদালতে জমি সংক্রান্ত নোটিশের বিরুদ্ধে সুরক্ষা মিললেও, বেঁচে থাকার মূল উপাদান সুপেয় পানি সরবরাহের কোনো দীর্ঘস্থায়ী সমাধান মেলেনি। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এবং বিভিন্ন মানবাধিকার কর্মীরা অবিলম্বে জরুরি ভিত্তিতে এই কলোনিতে মানবিক সুবিধাদি ও পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে প্রশাসনিক দপ্তরগুলোতে চিঠি পাঠিয়েছেন।