ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করছে বলে অভিযোগ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও ডাকসু সভাপতি অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম।
তিনি বলেছেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে একটি ‘দ্বৈত প্রশাসন’ তৈরি হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো উন্নয়ন বা পরিবর্তনমূলক কাজ করতে হলে প্রশাসনের অনুমোদন প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ডাকসু নেতারা জানিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তারা ৩৫ লাখ টাকা বরাদ্দ পেয়েছেন। তবে বিভিন্ন প্রকল্পে বাইরে থেকে সহায়তা ও অনুদান নিয়ে ৩৫ কোটি টাকার বেশি ব্যয় করা হয়েছে বলে তাদের দাবি। এসব প্রকল্পের মধ্যে মেডিকেল সেন্টার ও কেন্দ্রীয় মসজিদ সংস্কার এবং আবাসিক হলের রিডিং রুমে এসি স্থাপনের কাজ রয়েছে।
তবে এসব অর্থ ও প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো প্রকাশ করা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও ডাকসুর সাবেক নেতারা প্রকল্পগুলোর অনুমোদন, অনুদানের হিসাব এবং ভবিষ্যৎ রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী কাজী মো. আকরাম হোসেন জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো অর্থায়ন বা উন্নয়নমূলক কাজ করতে হলে আগে প্রশাসনের কাছে প্রস্তাব দিতে হয়। যাচাই-বাছাইয়ের পর প্রশাসন অনুমোদন দেয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার দাবি, ডাকসুর নেওয়া অধিকাংশ প্রকল্পই আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়াই বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
উপাচার্য অধ্যাপক ওবায়দুল ইসলাম বলেন, বাইরে থেকে অর্থ বা পণ্য আনা হলে তারও স্পষ্ট হিসাব বিশ্ববিদ্যালয়কে দেওয়া উচিত। ডাকসু শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন বাস আনার উদ্যোগ নিয়েছে উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন করেন, ওই বাসের জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ কে বহন করবে।
ডাকসুর কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক এইচ এম মোশাররফ হোসেন জানান, বাইরে থেকে আসা কোনো অর্থ বা প্রকল্পের বিষয়ে তাকে বিস্তারিত জানানো হয়নি। তার মতে, কোনো প্রতিষ্ঠান সরাসরি পণ্য কিনে দিলে এবং তা ডাকসুর অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে না এলে সেই অর্থ বা পণ্যের হিসাব তার কাছে থাকে না।
ডাকসুর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, তহবিল তদারকি, ব্যয় অনুমোদন, অনুমোদিত বাজেট অনুযায়ী খরচ নিশ্চিত করা এবং হিসাব সংরক্ষণের দায়িত্ব কোষাধ্যক্ষের। কমনরুম, রিডিং রুম, ক্যাফেটেরিয়া, সামাজিক-সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ও নির্ধারিত রুটে পরিবহন তদারকির দায়িত্বও ডাকসুর।
তবে বাইরে থেকে অর্থ এনে নিজ উদ্যোগে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ বা সংস্কারের বিষয়ে ডাকসুর গঠনতন্ত্রে স্পষ্ট কোনো দায়িত্ব উল্লেখ নেই।
অর্থ ও কেনাকাটার নথিপত্র সম্পর্কে ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ বলেন, অডিট শেষ হলে প্রকল্পের ব্যয় ও কেনাকাটার সব তথ্য প্রকাশ করা হবে। তার দাবি, প্রতিটি প্রকল্প ডাকসুর সভায় আলোচনা ও রেজুলেশনের মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে। কিছু স্পন্সর সরাসরি সরঞ্জাম কিনে দিয়েছে, আবার কিছু প্রকল্পে ডাকসুর অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে অর্থ ব্যয় হয়েছে।
বৃহস্পতিবার ডাকসু ভবনের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে গত এক বছরের কার্যক্রম ও জবাবদিহি নিয়ে প্রতিবেদন তুলে ধরেন ডাকসুর ভিপি আবু সাদিক কায়েম। সেখানে বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যয়ের তথ্যও দেওয়া হয়।
ডাকসুর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, আবাসিক হলে ছারপোকা দমন ও পরিচ্ছন্নতায় ৩২ লাখ টাকা, শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. মোহাম্মদ মোর্তজা মেডিকেল সেন্টার আধুনিকায়নে ৩ কোটি টাকা, কেন্দ্রীয় মসজিদ সংস্কারে সাড়ে ৩ কোটি টাকা এবং ছাত্রীদের জন্য জিমনেশিয়াম নির্মাণে ৬৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।
এ ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ হল সংস্কারে ৭ কোটি ৫১ লাখ টাকা সংগ্রহ এবং শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্র ও ক্রিকেট মাঠ উন্নয়নে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পক্ষ থেকে ২ কোটি টাকার একটি চেক বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়। কার্জন হলসংলগ্ন মূসা খাঁ মসজিদ সংস্কারেও যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় প্রায় ৩ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা জানানো হয়।
কেন্দ্রীয় মসজিদ সংস্কারের বিষয়ে ডাকসুর ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম জানান, একজন দাতা পরিচয় গোপন রাখার শর্তে এ কাজের অর্থ দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, কাজ শুরুর আগে অনুমতি চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে আবেদন করা হয়েছিল।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী আকরাম হোসেন বলেন, ওই আবেদন অনুমোদন করা হয়নি। তার ভাষ্য, নোটটি প্রশাসনের কাছে পাঠানো হলেও পরে তা ফেরত আসে।
মেডিকেল সেন্টার সংস্কারের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ জাহাঙ্গীর আলম জানান, প্রশাসনের পক্ষ থেকে তুর্কি সংস্থা টিআইকেএর সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল। তবে ভবন সংস্কার ও চিকিৎসা সরঞ্জাম স্থাপনের বিষয়টি অনুমোদিত হয়েছিল কি না, তা তিনি নিশ্চিত নন।
অন্যদিকে প্রধান প্রকৌশলী ও উপাচার্য জানিয়েছেন, এ ধরনের প্রকল্পের অনুমোদনের বিষয়ে তারা অবগত নন।
এদিকে কয়েকটি আবাসিক হলের রিডিং রুমে ডাকসুর উদ্যোগে এসি বসানো হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জানিয়েছেন, হলে এসি বসানোর কোনো অনুমোদন বিশ্ববিদ্যালয় দেয়নি। নতুন এসির কারণে বিদ্যুৎ ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বাড়ার আশঙ্কাও জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা।
এর আগে ডাকসু ভবনের পাশে ও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতি ছাড়া ‘নির্ভীক জুলাই’ স্মারক স্থাপনের বিষয়েও প্রশাসন আপত্তি জানিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় জানিয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ, ১৯৭৩ অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তি সিন্ডিকেটের কর্তৃত্বাধীন। এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
এর আগে অনুমোদন ছাড়া ডাকসুর বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছিল, ক্যাম্পাসে কোনো সমান্তরাল কাঠামো বা প্রক্রিয়া চালানোর সুযোগ নেই। ডাকসুর সব কার্যক্রম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, বিধি, নীতিমালা ও প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হতে হবে বলেও জানানো হয়।
ডাকসুর কার্যক্রম নিয়ে সাবেক নেতারাও প্রশ্ন তুলেছেন। সাবেক ডাকসু ভিপি নুরুল হক নূর বলেন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ছাত্র সংসদের মূল কাজ হওয়া উচিত নয়। সাবেক জিএস মুশতাক হোসেনের মতে, স্থায়ী নির্মাণ বা সংস্কারের কাজ বিশ্ববিদ্যালয় বা সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে হওয়া উচিত।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতি ছাড়া অবকাঠামো উন্নয়ন বা সংস্কার করা হলে তা স্বচ্ছতার প্রশ্ন তৈরি করে। পুরো বিষয়টি কীভাবে হয়েছে, তা প্রশাসনের তদন্ত করা উচিত বলেও তিনি মত দেন।
এদিকে ডাকসু নেতৃত্বের দাবি, তারা নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী খাদ্যের মান তদারকি, আবাসন, নারী শিক্ষার্থীদের পরিবহন, মাতৃত্বকালীন ছুটি, অনলাইন ফি পরিশোধ, কমনরুম ও লাইব্রেরি উন্নয়ন, বাসসেবা, মেডিকেল সেন্টার এবং বিনামূল্যে স্যানিটারি প্যাড বিতরণসহ বিভিন্ন কাজ করেছে।
তবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অনেকে বলছেন, হলের খাবারের মান, ক্যাম্পাস নিরাপত্তা ও রেজিস্ট্রার ভবনের সেবার মতো কিছু সমস্যা এখনো রয়ে গেছে। নারী শিক্ষার্থীদের জন্য ব্রেস্টফিডিং কর্নার, চাইল্ড কেয়ার কর্নার, নিরাপদ যাতায়াত ও আত্মরক্ষা প্রশিক্ষণের মতো কিছু উদ্যোগে অগ্রগতি হলেও আরও কয়েকটি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি বলে তারা জানিয়েছেন।
সূত্র: ডেইলি স্টার বাংলা