একই পরিবারের তিন প্রজন্ম, একই বিশ্বমঞ্চ। চার দশকের বেশি সময়ের ব্যবধানে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের কথা বলার ধারাবাহিকতায় এবার যুক্ত হতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে ভাষণ দেবেন তিনি।
এর আগে ১৯৮০ সালে জাতিসংঘের ১১তম বিশেষ অধিবেশনে বক্তব্য দিয়েছিলেন তাঁর বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ১৯৯৩ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে একই বিশ্বমঞ্চে বক্তব্য রেখেছেন তাঁর মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। ফলে তারেক রহমানের প্রথম জাতিসংঘ ভাষণ জিয়া পরিবারের তিন প্রজন্মের আন্তর্জাতিক উপস্থিতির ধারাবাহিকতায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করছে।
সময় বদলেছে, বদলেছে বাংলাদেশের বাস্তবতাও। ১৯৮০ সালে জিয়াউর রহমানের সামনে ছিল দারিদ্র্য, খাদ্যসংকট ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বৈষম্যের মতো চ্যালেঞ্জ। জাতিসংঘের ভাষণে তিনি ধনী ও দরিদ্র দেশের ব্যবধান কমানো, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছিলেন।
এর ১৩ বছর পর ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর জাতিসংঘের ৪৮তম অধিবেশনে প্রথম বক্তব্য দেন খালেদা জিয়া। এরপর ১৯৯৫ সালের জাতিসংঘের ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সভা, ২০০২ সালের শিশুবিষয়ক বিশেষ অধিবেশন এবং ২০০৫ সালের ৬০তম অধিবেশনের দুটি সভায়ও বক্তব্য দেন তিনি। জাতিসংঘের নথি অনুযায়ী, ১৯৯৩ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে সাধারণ পরিষদের কার্যক্রমে মোট পাঁচবার বক্তব্য দেন খালেদা জিয়া।
এবার সেই ধারাবাহিকতায় যুক্ত হচ্ছেন তারেক রহমান। তাঁর ভাষণে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর, আইনের শাসন, জবাবদিহি, বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকট এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সমান সুযোগের মতো বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তন এবারের সফরে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। ২৩ সেপ্টেম্বর জলবায়ু কার্যক্রম ও ন্যায্য রূপান্তর নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। সেখানে জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, ক্ষয়ক্ষতি ও জলবায়ু ন্যায়বিচারের বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার কথা রয়েছে। ২৪ সেপ্টেম্বর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকি নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে উদ্বোধনী বক্তব্য দেবেন তিনি।
রোহিঙ্গা সংকটও সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ২০১৭ সালের পর মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন ফোরামে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে তাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চেয়ে আসছে। এবারের সফরেও এ বিষয়ে কার্যকর আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আহ্বান জানাবেন প্রধানমন্ত্রী।
বাংলাদেশের জন্য এবারের জাতিসংঘ অধিবেশন আরেকটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। গত ২ জুনের নির্বাচনে তিনি ১৯০টি ভোটের মধ্যে ৯৯ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। ফলে একই অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বিশ্বনেতাদের সামনে দেশের অবস্থান তুলে ধরবেন, আর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
চার দশকের বেশি সময়ের এই ধারাবাহিকতায় তিনটি সময়ের বাংলাদেশকে দেখা যায়। ১৯৮০ সালে জিয়াউর রহমানের সামনে ছিল নবীন রাষ্ট্রের দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা। পরে খালেদা জিয়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও বাংলাদেশের বিভিন্ন স্বার্থ তুলে ধরেছেন। আর ২০২৬ সালে তারেক রহমানের সামনে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন, রোহিঙ্গা সংকট, প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মতো নতুন বাস্তবতা।
একটি মঞ্চ, তিন প্রজন্ম এবং চার দশকের বেশি সময়ের ধারাবাহিকতা—জিয়া পরিবারের জাতিসংঘ-অধ্যায়ের গল্পকে এভাবেই দেখা যায়। ২৪ সেপ্টেম্বর তারেক রহমানের প্রথম ভাষণ সেই ধারাবাহিকতায় নতুন একটি অধ্যায় যোগ করবে। একই সঙ্গে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান, স্বার্থ ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা তুলে ধরার সুযোগও তৈরি করবে।