বিশ্বের একটি বড় অংশের মানুষের ঘুম ভেঙেছে সাইবার হামলার খবর শুনে। পিএইচপি নামক একটি কোডিং ল্যাঙ্গুয়েজে হ্যাক করার মতো নিরাপত্তা ত্রুটি পাওয়ার পর বিশ্বজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। পিএইচপি বিশ্বের প্রায় ৭০% ওয়েবসাইটের মূল ভিত্তি। তাই বিশ্বের সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের সাইটগুলো নিরাপত্তার কারণে বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।
যদিও পিএইচপি-র এই ত্রুটিগুলো ওয়েবসাইটের ভেতরের মূল কোডের মধ্যেই রয়েছে। তবে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এনএসএ সতর্ক করেছে যে, আক্রমণকারীরা এই ত্রুটিকে কাজে লাগিয়ে ওয়েব সার্ভারের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে।
এই হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে তারা ডেটা চুরি করা, সেবা ব্যাহত করা কিংবা সাধারণ মানুষ প্রতিদিন নির্ভর করে এমন নেটওয়ার্কগুলোতে অনধিকার প্রবেশ করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর প্রধান দায় মূলত সফটওয়্যার সরবরাহকারী এবং গ্রাহকদের সেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরই বর্তায়। তবে নিজেদের সুরক্ষায় আপনিও চাইলেও পদক্ষেপ নিতে পারেন।
মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন ব্যবহার করুন
এমএফএ বা মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন হলো এমন এক ব্যবস্থা, যেখানে কোনো সুরক্ষিত সাইটে প্রবেশ করতে পাসওয়ার্ডের পাশাপাশি আরেকটি মাধ্যম (যেমন: ফোনে আসা টেক্সট কোড বা সিকিউরিটি কি) ব্যবহার করতে হয়।
সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা ‘সেনসিস’-এর প্রধান নিরাপত্তা গবেষক এমিলি অস্টিন প্রতিটি ওয়েবসাইটের জন্য আলাদা ও অনন্য পাসওয়ার্ড ব্যবহারের এবং যেকোনো আর্থিক লেনদেনের ওপর নজর রাখার পরামর্শ দিয়েছেন।
অস্টিন বলেন, ‘তবে বাস্তবিকভাবে, পিএইচপি-র এই ত্রুটিগুলোর মতো পরিস্থিতিতে সাধারণ ব্যবহারকারীদের তেমন কিছুই করার থাকে না। তারা কেবল আশা করতে পারে যে, তাদের ব্যবহৃত সেবাগুলো যেন পিএইচপি ব্যবহার না করে অথবা সেগুলোর পেছনে থাকা কর্মীরা যেন দ্রুত এই ত্রুটি দূর করতে (প্যাচিং) কাজ করেন।’
পিএইচপি-র এই ত্রুটিগুলো হলো বর্তমানের একগুচ্ছ মারাত্মক সফটওয়্যার বাগের সর্বশেষ উদাহরণ, যা দিন দিন আরও শক্তিশালী ও সহজলভ্য হতে থাকা লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলগুলোর (এআই) কারণে আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। বহুল ব্যবহৃত সফটওয়্যারগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে লুকিয়ে থাকা যেসব ত্রুটি আগে মানুষের পক্ষে খুঁজে বের করা বা কাজে লাগানো অসম্ভব জটিল ছিল, তা এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে খুব সহজেই সামনে আনা এবং সাইবার অস্ত্রে রূপান্তর করা সম্ভব হচ্ছে।
হার্ডওয়্যার আপডেট স্বয়ংক্রিয় রাখুন
সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা ‘ট্রেইল অফ বিটস’-এর প্রধান নির্বাহী ও সহ-প্রতিষ্ঠাতা ড্যান গুইডো পরামর্শ দিয়েছেন, মানুষ যেন তাদের “ফোন, কম্পিউটার এবং বাড়ির রাউটারের স্বয়ংক্রিয় আপডেট চালু রাখে।”
সাধারণ কোনো ত্রুটির সমাধান বা প্যাচ তৈরি হলে কোম্পানিগুলো দ্রুত নিরাপত্তা আপডেট প্রকাশ করে। তাই এগুলো সঙ্গে সঙ্গে ইনস্টল করলে অপরাধীদের সুযোগ কমে যায়।
তবুও গুইডো বলেন, গ্রাহকেরা শেষ পর্যন্ত তাদের ব্যবহৃত সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরই নির্ভরশীল। তিনি বলেন, “একজন ব্যবহারকারী টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন ব্যবহার করার মতো সবকিছু ঠিকঠাক করার পরও তার তথ্য ফাঁস হয়ে যেতে পারে। কারণ, আপনি তো আর আপনার হাসপাতালের ওয়েবসাইট মেরামত বা প্যাচ করতে পারবেন না।”
গুইডো মনে করেন, মূল কাজটি করতে হবে সেবা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে। তাদের দ্রুত এই ত্রুটিগুলো সংশোধন করতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত সিস্টেম যাতে বেশি ক্ষতি করতে না পারে, সেই ব্যবস্থা নিতে হবে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এবং ‘গ্রানিট’-এর প্রতিষ্ঠাতা রুনা স্যান্ডভিক বলেন, ব্যবহারকারীদের উচিত তাদের ডিভাইসের অ্যাপ ও সেবাগুলোর আপডেট আসামাত্রই তা ইনস্টল করা এবং বাড়ির ইন্টারনেট-সংযুক্ত অন্যান্য ডিভাইসের কথা ভুলে না যাওয়া।
স্যান্ডভিক বলেন, “এমনটা হতেই পারে যে অনেকের বাড়িতে এমন কিছু আইওটি ডিভাইস রয়েছে যা হয়তো নিয়মিত আপডেট পায় না, কিংবা একেবারেই পায় না। তাই বিক্রেতা বা ভেন্ডরের কাছ থেকে কোনো আপডেট উপলভ্য আছে কি না, তা যাচাই করে নেওয়া উচিত।”
দ্রুত ত্রুটি সংশোধন (প্যাচ) করুন
‘সারে সেন্টার ফর সাইবার সিকিউরিটি’ এবং ‘ইউনিভার্সিটি অব সারে’-র লেকচারার ডক্টর ড্যানিয়েল গার্ডহ্যাম বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবশ্যই জানতে হবে তারা কোন সফটওয়্যার ব্যবহার করছে। দ্রুত সেগুলোর ত্রুটি মেরামত করতে হবে। তারা ইতিমধ্যে হ্যাকিংয়ের শিকার হয়েছে কী না তা পরীক্ষা করতে হবে। তিনি আরও যোগ করেন, এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে আক্রমণকারীরা বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে।
গার্ডহ্যাম বলেন, ‘‘ত্রুটি খুঁজে পাওয়া এখন অনেক দ্রুত ও সহজ হয়ে গেছে, কিন্তু এই সফটওয়্যারের ওপর নির্ভরশীল হাজারো সিস্টেমে তা সংশোধন করা অনেক কঠিন। প্রতিষ্ঠানগুলো এই ব্যবধান কত ভালোভাবে সামাল দিতে পারছে, তার ওপরই নির্ভর করবে এআই ইন্টারনেটকে আরও নিরাপদ করবে নাকি আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলবে।’’
সাইবার কাইনেটিক্স কোম্পানি ‘০র্কাস’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী নিক অ্যাডামস বলেন, যখনই কোনো বড় সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকির খবর প্রকাশ পায়, প্রতারক ও সাইবার অপরাধীরা সেটির সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে।
অচেনা লিংকে ক্লিক নয়
অযাচিত বা অচেনা কোনো লিংকের বিষয়ে সতর্ক থাকুন। অ্যাডামস বলেন, ‘‘এমন খবর সামনে এলে, কোনো লিংকে ক্লিক না করে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির নিজস্ব অ্যাপ খুলে বা ব্রাউজারে ওয়েবসাইটের ঠিকানা সরাসরি টাইপ করে তাদের নির্দেশনা যাচাই করুন।’’
‘আপনার অ্যাকাউন্ট সুরক্ষিত করুন’— এমন কোনো জরুরি বার্তা এলে তা অতিরিক্ত সতর্কতার সাথে যাচাই করা উচিত।
আপনার অর্থ নিরাপদ আছে
এই পিএইচপি ত্রুটির পর, সাধারণ কোনো অনলাইন শপ বা ওয়েবসাইট থেকে কেনাকাটা করার সময় গ্রাহকদের সচেতন হতে হবে। কারণ সেসব ওয়েবসাইটের নিরাপত্তা আপনার ব্যাংকের মতো শক্তিশালী নাও হতে পারে।
ক্রেতাদের উচিত বিভিন্ন শপিং সাইটে একই পাসওয়ার্ড বারবার ব্যবহার না করা। সম্ভব হলে ‘পাসকি’ (Passkeys) ব্যবহার করা উচিত। যা নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটের জন্য ডিজিটাল চাবির মতো কাজ করে। এটি পাসওয়ার্ড দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা দূর করে এবং ফিশিং প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকরী।
সূত্র: বিবিসি