ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এক ‘ঐতিহাসিক চ্যালেঞ্জ’-এর মুখে পড়েছে বলে এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইরানের বিপুল সংখ্যক কম খরচের ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় মার্কিন সামরিক ভাণ্ডারে বড় চাপ তৈরি হয়েছে।
ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের প্রায় দুই সপ্তাহের মধ্যেই তেহরান মার্কিন সামরিক অস্ত্রভাণ্ডারে উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের হামলা প্রতিহত করতে যুক্তরাষ্ট্র ও পারস্য উপসাগরীয় মিত্ররা ১,০০০টিরও বেশি প্যাট্রিয়ট প্যাক-৩ ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে, যা এই অস্ত্রের বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ।
স্টিমসন সেন্টারের জ্যেষ্ঠ ফেলো কেলি গ্রিকো বলেন, ‘দূরপাল্লার নিখুঁত হামলার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন নেতৃত্ব দিয়েছে। কিন্তু এই প্রথম এমন একটি যুদ্ধে আমরা দেখছি প্রতিপক্ষেরও একই ধরনের সক্ষমতা রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এটি এমন চাপ সৃষ্টি করছে, যা আগে দেখা যায়নি।’
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করার পর থেকেই ইরানের সশস্ত্র বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলা শুরুর পরপরই ইরান পারস্য উপসাগর অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন স্থাপনাগুলোর দিকে ৩০০টিরও বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে এবং এর পাশাপাশি ‘শাহেদ’ একমুখী আক্রমণাত্মক ড্রোনও ব্যবহার করে।
বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়, এই যুদ্ধে ব্যয়ের বৈষম্যও ব্যাপক। একটি ইরানি শাহেদ ড্রোন তৈরিতে ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার ডলার খরচ হয়, অথচ সেটি ভূপাতিত করতে ব্যবহৃত একটি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের দাম প্রায় ৪ মিলিয়ন ডলার।
এছাড়া জর্ডানে ইরানের একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক থ্যাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি রাডার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মূল্য প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার।
প্রতিবেদনটি আরও জানায়, ইরানের ৩৫৮ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার মাধ্যমে অন্তত সাতটি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন ধ্বংস করা হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের ‘আকাশে আধিপত্য’ ধারণাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
যুদ্ধ শুরুর প্রথম দুই দিনেই পেন্টাগন শুধু গোলাবারুদেই ৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এই ধরনের উচ্চপ্রযুক্তির নির্ভুল অস্ত্র পুনরায় উৎপাদন করতে পেন্টাগনের কয়েক বছর সময় লাগতে পারে, কারণ উৎপাদন সক্ষমতা সীমিত।
ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের মার্ক ক্যানসিয়ান বলেন, ‘এখন এটি এক ধরনের প্রতিযোগিতা—ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার আগে শেষ হবে, নাকি আমাদের।’
কার্নেগি এন্ডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের বিশ্লেষক অঙ্কিত পান্ডা বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন সম্ভবত ইরানের সহনশীলতা এবং পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতাকে অবমূল্যায়ন করেছে।
এদিকে খতম আল-আনবিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের কমান্ডার মেজর জেনারেল আলি আবদুল্লাহি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সব সময়ই ইরান সম্পর্কে ভুল হিসাব করেছে।
তিনি দাবি করেন, ইরানের কাছে অত্যাধুনিক ও অত্যন্ত নির্ভুল অস্ত্র রয়েছে, যা শত্রুর ধারণার চেয়েও বেশি শক্তিশালী।
তিনি আরও বলেন, ‘ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে আগ্রাসন চালানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল অনুতপ্ত না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চলবে।’ সূত্র: প্রেস টিভি