প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বিএনপি যে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছে, তার প্রতিটি শব্দ এবং প্রতিটি অঙ্গীকার ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। সোমবার বগুড়া শহরের আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় তিনি এ ঘোষণা দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের সামনে দেওয়া প্রতিশ্রুতি থেকে সরকার সরে যাবে না। তিনি অভিযোগ করেন, কিছু রাজনৈতিক পক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে জুলাই সনদ নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে। তাঁর ভাষায়, বারবার পরিষ্কার ব্যাখ্যা দেওয়ার পরও কিছু মহল সংসদের ভেতরে ও বাইরে ভুল ব্যাখ্যা তুলে ধরে জনগণকে বিভ্রান্ত করতে চাইছে।
সভায় তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন পর দেশের মানুষ তাদের ভোটাধিকার ও মতপ্রকাশের অধিকার ফিরে পেয়েছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ বিএনপিকে আগামী পাঁচ বছরের জন্য দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এক যুগেরও বেশি সময় ধরে মানুষের বাক-স্বাধীনতা, রাজনৈতিক অধিকার ও ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছিল, আর উন্নয়নের নামে চলেছিল প্রতারণা ও লুটপাট।
তারেক রহমান জানান, নির্বাচনের আগে দেওয়া অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সরকার ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। তিনি বলেন, মায়েদের স্বাবলম্বী করতে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি কৃষকদের জন্য কৃষি কার্ড বিতরণ এবং ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফের প্রতিশ্রুতিও সরকার বাস্তবায়ন করেছে। তাঁর দাবি, সরকার গঠনের প্রথম ১০ দিনের মধ্যেই ১২ লাখ কৃষকের ঋণ মওকুফ সম্পন্ন হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী সমালোচনা করে বলেন, যারা এখন সংস্কারের কথা বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে, তারা নারীর উন্নয়ন, চিকিৎসা ব্যবস্থা, ওষুধপ্রাপ্তি, প্রশাসনিক সংস্কার বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন নিয়ে কোনো বাস্তব কথা বলে না। বরং তারা কেবল সংবিধানের প্রশ্নটিকেই সামনে এনে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা করছে।
তিনি সাম্প্রতিক একটি ব্যক্তিগত ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির চেষ্টার অভিযোগও তোলেন। তাঁর বক্তব্য, সামাজিক বা পারিবারিক একটি বিষয়কে ইচ্ছাকৃতভাবে রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করে দেশে উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে, যা অতীতের কিছু ঘটনার পুনরাবৃত্তি বলে মনে হয়।
বক্তৃতায় বিএনপির সংস্কার ভাবনার ইতিহাসও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ২০১৬ সালে খালেদা জিয়া রাষ্ট্র পরিচালনার একটি রূপরেখা দিয়েছিলেন, আর তারই ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালের ১২ জুলাই বিএনপি ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব ঘোষণা করে। তাঁর দাবি, তখন অন্য কোনো রাজনৈতিক দল স্বৈরশাসনের ভয়ে সংস্কারের কথা উচ্চারণ পর্যন্ত করেনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিগত ১৬ বছরে দেশের স্বাস্থ্য, ব্যাংকিং, যোগাযোগ ও শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। কিছু বড় প্রকল্পের আড়ালে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
এদিন বগুড়ায় একাধিক কর্মসূচিতে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। সকালে তিনি জেলা ও দায়রা জজ আদালতে ই-বেইলবন্ড সিস্টেম উদ্বোধন করেন, যার মাধ্যমে বগুড়াসহ সাত জেলায় এই ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু হলো। তিনি বলেন, বিচারব্যবস্থাকে হয়রানিমুক্ত, দ্রুত ও স্বচ্ছ করতে সরকার আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা চালু করছে। তাঁর মতে, বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি কমাতে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তিনি আরও বলেন, বিচার বিভাগকে জনগণের আস্থা ও ন্যায়ের জায়গা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। আদালত যেন হয়রানির নয়, বরং ন্যায়বিচারের নিরাপদ আশ্রয় হয়ে ওঠে, সরকার সেই লক্ষ্যেই কাজ করছে।
এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী বগুড়া পৌরসভাকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন, হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি উদ্বোধন করেন, ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করেন এবং খাল খনন কর্মসূচির সূচনা করেন। দিনভর এসব কর্মসূচিতে বগুড়ার বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক জনসমাগম দেখা যায়।