মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠকে বাংলাদেশ–মালয়েশিয়া সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা, শ্রমবাজার উন্মুক্তকরণ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, তথ্যপ্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, রোহিঙ্গা সংকটসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
সোমবার (২২ জুন) পুত্রজায়ায় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ‘পেরদানা পুত্রা’ ভবনে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে আলোচনার বিষয়গুলো তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
যৌথ সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের কাছ থেকে পাওয়া শুভেচ্ছা ও সফরের আমন্ত্রণের জন্য তিনি কৃতজ্ঞ।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে মালয়েশিয়ায় আসতে পেরে তিনি সম্মানিত বোধ করছেন। সফরে তার স্ত্রীও সঙ্গে রয়েছেন বলে জানান তিনি।
তারেক রহমান বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা তুলে ধরে বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক পারস্পরিক আস্থা, অভিন্ন মূল্যবোধ এবং জনগণের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের সঙ্গে মালয়েশিয়ার সম্পর্কের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯৭৯ সালের মালয়েশিয়া সফরের কথা স্মরণ করেন।
তিনি বলেন, ওই সফর দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করেছিল এবং শ্রম খাতে সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি করেছিল।
একই সঙ্গে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ১৯৯৩ সালের মালয়েশিয়া সফরের কথাও উল্লেখ করেন। তার মতে, ওই সফর দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও গভীর করতে ভূমিকা রেখেছিল।
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে সম্মতি
তারেক রহমান জানান, আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়েও মতবিনিময় করেছেন দুই নেতা।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া বিদ্যমান সহযোগিতার কাঠামো আরও কার্যকর করার বিষয়ে একমত হয়েছে। এর মধ্যে দুই দেশের যৌথ কমিশনের বৈঠক এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে নিয়মিত আলোচনা প্রক্রিয়া জোরদারের বিষয় রয়েছে।
দুই দেশের বাণিজ্য বৃদ্ধির বিষয়টি স্বাগত জানিয়ে বাংলাদেশ–মালয়েশিয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলেও জানান তিনি।
বিনিয়োগ বাড়াতে মালয়েশিয়ার প্রতি আহ্বান
বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য মালয়েশিয়ার ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ একটি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করছে এবং মালয়েশিয়ার বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।
তিনি বলেন, মালয়েশিয়ার বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশে বড় সম্ভাবনা রয়েছে।
তথ্যপ্রযুক্তি থেকে সেমিকন্ডাক্টর খাতে সহযোগিতা
দুই দেশের বৈঠকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি), জ্বালানি, অবকাঠামো, দক্ষ জনশক্তি, হালাল শিল্প, কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাতকরণ, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রতিরক্ষা, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং সেমিকন্ডাক্টরসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
তারেক রহমান বলেন, এসব খাত দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দিতে পারে।
বিশেষ করে উচ্চমূল্য সংযোজন শিল্প ও প্রযুক্তিনির্ভর খাতে মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলেও জানান তিনি।
শ্রমবাজার উন্মুক্তের আহ্বান
বৈঠকে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত উন্মুক্ত করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, মালয়েশিয়ায় আরও বেশি বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করতে তিনি প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমকে অনুরোধ করেছেন।
তিনি বলেন, মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত অনিয়মিত বাংলাদেশি শ্রমিকদের বৈধকরণ এবং আটক বাংলাদেশিদের সম্ভাব্য প্রত্যাবাসনের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
তারেক রহমান বলেন, দুই দেশ একমত হয়েছে যে শ্রমিক নিয়োগ প্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ, ন্যায্য ও সাশ্রয়ী। এতে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমবে এবং শ্রমিকদের খরচও কমবে।
মালয়েশিয়ায় থাকা বাংলাদেশিদের অবদান
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মালয়েশিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশি শ্রমিক, শিক্ষার্থী, পেশাজীবী ও উদ্যোক্তারা দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তাদের অবদান দুই দেশের অর্থনীতি ও সমাজে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
রোহিঙ্গা সংকটে মালয়েশিয়ার সহযোগিতা
বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন।
তিনি এ বিষয়ে মালয়েশিয়ার অব্যাহত সহযোগিতার প্রশংসা করেন।
আসিয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে আগ্রহী বাংলাদেশ
প্রধানমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক জোট আসিয়ানের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়।
বাংলাদেশ আসিয়ানের সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলেও জানান তিনি।
এ ছাড়া আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব (আরসিইপি)-এ যুক্ত হওয়ার আগ্রহের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
আন্তর্জাতিক ইস্যুতে একসঙ্গে কাজ করবে দুই দেশ
বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
তারেক রহমান বলেন, জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থায় পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া একসঙ্গে কাজ করবে।
তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতিত্বের জন্য বাংলাদেশের প্রার্থিতাকে সমর্থন করায় মালয়েশিয়াকে ধন্যবাদ জানান।
কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল বিনিময়
দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বৈঠকের পর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল বিনিময় করা হয়।
এর মধ্যে সংস্কৃতি বিষয়ক সহযোগিতা, সন্ত্রাসবাদ দমন বিষয়ে গবেষণা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ সহযোগিতা সংক্রান্ত দলিল রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, এসব উদ্যোগ বাংলাদেশ–মালয়েশিয়া সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেবে।
আনোয়ার ইব্রাহিমকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ
সংবাদ সম্মেলনে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ও তার সহধর্মিণীকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান তারেক রহমান।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণ তাদের স্বাগত জানাতে গর্ববোধ করবে।
প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়া সরকার ও জনগণের উষ্ণ অভ্যর্থনা ও আতিথেয়তার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী হবে।