জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার প্রথম দিনেই গতকাল বৃষ্টি উপেক্ষা করে দর্শনার্থীর ঢল নেমেছে ‘জুলাই গণ অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে’। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা ও বয়সের মানুষ জুলাইয়ের স্মৃতিবিজড়িত এই জাদুঘরটি দেখতে আসেন। কেউ এসেছেন বন্ধুবান্ধব নিয়ে, আবার কেউ পরিবার-পরিজন নিয়ে।
জুলাই গণ অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীর দিন ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাদুঘরটির উদ্বোধন করেন। গতকাল তা সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। ১২ বছরের ঊর্ধ্বে দর্শনার্থীদের জন্য ৫০ টাকা এবং ১২ বছরের নিচে শিশুদের জন্য ২০ টাকা টিকিটের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অনলাইন ও অফলাইন দুই মাধ্যমেই টিকিট সংগ্রহ করা যাচ্ছে। জাদুঘরটি প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকছে। গতকাল সরেজমিন দেখা যায়, জাদুঘর উন্মুক্ত করার পর সকাল থেকেই দর্শনার্থীরা টিকিটের জন্য ভিড় করছেন। মূল ফটক দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে জুলাইয়ের স্মৃতি নিয়ে আঁকা রঙিন গ্রাফিতিগুলো, যেখানে আন্দোলনের দিনগুলো ও তৎকালীন সরকারের অত্যাচার-পীড়নের চিত্র ফুটে উঠেছে। একটু সামনে এগোলেই চোখে পড়ে দেয়ালে খোদাই করা বীর শহীদদের নামের তালিকা।
এরপর মূল প্রদর্শনী কক্ষে রয়েছে তৎকালীন সরকারের নির্যাতনের নানা প্রমাণ-শিক্ষার্থী, শিশু ও সাধারণ মানুষের ওপর সহিংসতার চিত্র। পাশাপাশি শেখ হাসিনা সরকারের বিতর্কিত ‘আয়নাঘর’-এর আদলে তৈরি করা হয়েছে একটি প্রতীকী রূপ। জাদুঘরটি সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেওয়ায় সাধারণ মানুষ বেশ উচ্ছ্বসিত। ইতিহাসের সঠিক চিত্র তুলে ধরার জন্য দর্শনার্থীরা সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। জাদুঘরে দায়িত্বরত এক কর্মী বলেন, ‘সকাল থেকেই দর্শনার্থীর প্রচুর ভিড় রয়েছে। বৃষ্টি থাকা সত্ত্বেও অনেকে ভিজে ভিজে পুরো জাদুঘরটি ঘুরে দেখেছেন। উদ্বোধনের প্রথম দিনেই মানুষের যে উৎসাহ দেখলাম, সরকারি ছুটির দিনে এই চাপ আরও কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাবে বলে মনে হচ্ছে।’ তিনি সব দর্শনার্থীকে প্রদর্শনী সামগ্রী স্পর্শ না করার অনুরোধ জানান। জাদুঘর পরিদর্শনে আসা রবিন মিয়া নামে এক জুলাই যোদ্ধা বলেন, ‘আজ আমার গায়ে যে আঘাতের দাগগুলো রয়ে গেছে, তা হয়তো কোনো দিন মুছে যাবে না। তবে এর জন্য আমরা কোনো প্রতিদান বা সার্টিফিকেট চাই না। আমাদের একমাত্র চাওয়া এই দেশটা ভালো থাকুক, দেশের মানুষ ভালো থাকুক। আমার দাদা দেশের জন্য মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, যুদ্ধ করেছিলেন। তিনিও কোনো সার্টিফিকেটের পেছনে ছোটেননি। তিনিও একটি সুন্দর দেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন। আমরা কোনো বিশেষ সম্মান বা পদবি চাই না, আমরা আমাদের নিজস্ব অবস্থান থেকেই স্বাধীনভাবে মাথা উঁচু করে বাঁচতে চাই।’
ঢাকা মডেল কলেজের শিক্ষার্থী এস এম সামিউল ইসলাম বলেন, ‘৩৬ জুলাই (৫ জুলাই) আমরা এখানে এসেছিলাম, আজও আসলাম। তখনকার থমথমে পরিস্থিতি আর আজকের মুক্ত বাতাসের অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সবার জন্য জাদুঘরটি উন্মুক্ত করে দেওয়ায় সাধারণ মানুষ এখন স্বৈরাচারের অপকর্ম, সাধারণ মানুষের কষ্ট এবং শিক্ষার্থীদের ত্যাগের কথা সঠিকভাবে জানতে পারবে।’
সাদ বিন হারুন নামে আরেক দর্শনার্থী নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, ‘জাদুঘরে আসার পর বুঝতে পারলাম জুলাইয়ে দেশের পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ ছিল। ঢাকার ভিতরের কিছু খবর আমরা জানতাম, কিন্তু এখানে ঢাকার বাইরের বাস্তবচিত্রও চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ফ্যাসিস্ট সরকার সারা দেশে কীভাবে সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতন ও হত্যাকা চালিয়েছে, তা এখানে এসে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।’
সোর্স: বাংলাদেশ প্রতিদিন