অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য কাজ করছে সরকার। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতি করে দেশের অর্থনীতিকে গভীর খাদের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। সেই খাদ থেকে অর্থনীতিকে টেনে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা ভঙ্গুর একটা অর্থনীতি নিয়ে যাত্রা শুরু করেছি।
সেখান থেকে আমরা রিভাইভ করার চেষ্টা করছি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইরান যুদ্ধের সংকট। আমরা কিন্তু টাকা না ছাপিয়েই এই সংকট সামাল দিচ্ছি।’
গতকাল শনিবার সচিবালয়ে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সঙ্গে এক প্রাক-বাজেট আলোচনায় অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান, অর্থসচিব ড. খায়েরুজ্জামান মজুমদার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক, পরিকল্পনাসচিব এস এম শাকিল আখতার, এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান এতে অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে ইআরএফের পক্ষে সভাপতি দৌলত আকতার মালা লিখিত প্রস্তাবে সংগঠনটির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সাধারণ সদস্যরা আলোচনায় অংশ নেন।
এই অনুষ্ঠানের পর অর্থমন্ত্রী প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সম্পাদক ও প্রধান নির্বাহীদের সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনায় অংশ নেন। এ সময় তিনি আগামী বাজেট প্রসঙ্গে বলেন, ‘আপনারা দেশের বিনিয়োগ বাড়াতে বলেন, কর্মসংস্থান এবং মানুষের আয়-রোজগার বাড়াতে বলেন।
সমতার বাংলাদেশ গড়তে বলেন। বৈষম্য কমাতে বলেন। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থার মান উন্নয়ন করতে বলেন, অথচ বাজেটের আকার বাড়লে বলেন সেটা উচ্চাভিলাষী। কিন্তু এত কল্যাণকর কাজ করতে হলে তো বাজেটের আকার বাড়বেই।’
সম্পাদকদের মধ্যে এই সভায় অংশ নেন চ্যানেল আইয়ের পরিচালক শাইখ সিরাজ, ফিন্যানশিয়াল এক্সপ্রেসের সম্পাদক শামসুল হক জাহিদ, কালের কণ্ঠের সম্পাদক ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ, ডেইলি সান সম্পাদক রেজাউল করিম লোটাস, বাংলানিউজের সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু, ডিবিসি নিউজের সম্পাদক লোটন একরাম প্রমুখ।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা ভঙ্গুর একটা অর্থনীতি নিয়ে যাত্রা শুরু করেছি। সেখান থেকে আমরা রিভাইভ করার চেষ্টা করছি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইরান যুদ্ধের সংকট। আমরা কিন্তু টাকা না ছাপিয়েই এই সংকট সামাল দিচ্ছি। যদিও একটা গবেষণাপ্রতিষ্ঠান এ ধরনের একটা মিস-ইনফরমেশন ছড়িয়েছে যে আমরা ২০ হাজার কোটি টাকা ছাপিয়ে সংকট সামলাচ্ছি। সে তথ্য সঠিক নয়। প্রকৃত অর্থে আমরা কোনো টাকা ছাপাচ্ছি না। বেসরকারি খাতকে রক্ষা করাই আমাদের নীতি। আসছে বাজেটে বেসরকারি খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। আগামী বাজেটকে আরো গণমুখী করা হবে। বাজেট হবে জনকল্যাণকর। আমরা অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণে বিশ্বাসী। এ জন্য করহার নয়, করের আওতা বাড়ানোর দিকে নজর দিচ্ছি।’
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘দেশের দারিদ্র্যসীমা তো ক্রমান্বয়ে নিচের দিকেই নামছে। আমরা সেটাকেও অ্যাড্রেস করার চেষ্টা করছি। এমন একটা অবস্থায় আমরা আছি যে ব্যবসায়ীরা তাঁদের কর্মীদের বেতন দিতে পারছেন না। অনেকেই ব্যাংকের টাকা ফেরত দিতে পারছেন না। দেশে বৈষম্যও বেড়েছে। আপনারাও বৈষম্য কমানোর কথা বলছেন, আমাদেরও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি হলো সমতার সমাজ গঠন করা। এ জন্য আমাদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে গুরুত্ব দিতে হচ্ছে। শিক্ষা খাতের গবেষণা ও বিনিয়োগ বাড়াতে হচ্ছে। ঘরে ঘরে আমাদের শুধু বিএ আর এমএ ডিগ্রিধারী বানিয়ে লাভ নেই। আমাদের দরকার কর্মমুখী শিক্ষা। এ জন্য ভোকেশনালকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আমরা মানুষের দক্ষতা বৃদ্ধিতে নজর দিচ্ছি।’
তিনি বলেন, “টাকা ছাপিয়ে স্থানীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে অর্থনীতির যে ক্ষতি হয়েছে, সেখান থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। এই জায়গা থেকে আমরা সরব না। এই ধরনের নীতিতে একদিকে সুদের হার বেড়ে যায়, অন্যদিকে বেসরকারি খাত ‘ক্রাউড আউট’ হয়ে পড়ে, যা কোনোভাবেই টেকসই অর্থনীতির জন্য সহায়ক নয়। বর্তমান সরকার এমন একটি নীতিগত অবস্থানে থাকতে চায়, যেখানে উচ্চমাত্রার মুদ্রা সরবরাহ তৈরি করে মূল্যস্ফীতি বাড়ানো হবে না এবং বেসরকারি খাতের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হবে না। এটা আমাদের অর্থনৈতিক নীতির অন্যতম প্রধান গাইডলাইন ও প্রিন্সিপাল।”
খেলাপি ঋণ ও টাকা পাচার নিয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখতে চান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এ প্রসঙ্গে কালের কণ্ঠের সম্পাদকের বক্তব্যের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে এবং এ নিয়ে কাজ চলছে। এরই মধ্যে কিছু অগ্রগতিও হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এ ছাড়া আলোচনায় সাহিত্য, সংস্কৃতি ও প্রকাশনা খাতের উন্নয়নেও গুরুত্ব আরোপ করা হয়। লেখক, প্রকাশক ও সৃজনশীল কর্মীদের জন্য প্রণোদনা, বইশিল্পে সহায়তা এবং সম্মানি থেকে উৎস কর প্রত্যাহারের দাবিকে যৌক্তিক বলে মত দেওয়া হয়।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) এবং স্টার্টআপ খাতকে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সবচেয়ে বড় এমপ্লয়ার হচ্ছে এসএমই খাত। এ খাতের পাশাপাশি গ্রামীণ কুটির শিল্প, কারিগর ও সৃজনশীল শিল্পকে (ক্রিয়েটিভ ইকোনমি) অর্থনীতির মূলধারায় আনতে সরকার কাজ করছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, গ্রামীণ কারিগরদের পণ্যকে ডিজাইন, ব্র্যান্ডিং ও মার্কেটিং সহায়তা দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে কর্মসংস্থান বাড়বে এবং রপ্তানিও বৃদ্ধি পাবে। অর্থনীতির নতুন খাত হিসেবে স্পোর্টস, সংস্কৃতি, থিয়েটার, সিনেমা ও সংগীতকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এসব খাতও জিডিপিতে অবদান রাখে, কিন্তু এত দিন এগুলো উপেক্ষিত ছিল।
অর্থনীতির বর্তমান চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলার অভাব, মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বেসরকারি খাত চাপে রয়েছে। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ‘আন্ডারপারফরম’ করছে এবং কর্মসংস্থানও কমছে। ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো বর্তমান প্রেক্ষাপটে খুবই কঠিন কাজ। ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো না হলে কর আদায় বাড়ানো সম্ভব নয়। তবে সরকার এ লক্ষ্য অর্জনে কাজ করে যাচ্ছে।
জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করে তিনি বলেন, আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎস অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বাজার ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পুলিশ দিয়ে বা টিসিবি দিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। বাজারকে ডিমান্ড ও সাপ্লাই অনুযায়ী চলতে দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং ব্যবসার খরচ কমানোর ওপর জোর দেন তিনি। বিনিয়োগ বাড়াতে ডিরেগুলেশন প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান বলেন, ব্যবসা করতে এত বাধা থাকলে বিনিয়োগ আসবে না। করের আওতা বাড়ানো, ভ্যাট ফাঁকি রোধ এবং কর ব্যবস্থাকে আরো আধুনিক করতে একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হবে। বর্তমানে এক কোটি ২৮ লাখ টিআইএন (করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর) থাকলেও এর বিপরীতে সক্রিয় করদাতার সংখ্যা অনেক কম। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় ‘ক্লিনজিং অপারেশন’ চালিয়ে অকার্যকর বা অপ্রয়োজনীয় টিআইএন বাতিল করা হবে।
তিনি জানান, কর ফাইলিং প্রক্রিয়া পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অনলাইনে কর রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করা হলে যাঁরা রিটার্ন দাখিল করবেন না, তাঁদের কাছে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নোটিশ পাঠানো হবে। এতে নন-ফাইলারদের করজালে আনা সহজ হবে।
তিনি বলেন, প্রতিটি পণ্য উৎপাদন পর্যায় থেকেই ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের আওতায় আনা হবে। ফ্যাক্টরি থেকে পণ্য বের হওয়ার সময় তা যেন কর রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত হয়, তা নিশ্চিত করা হবে। ভোক্তারা স্মার্টফোনের মাধ্যমে পণ্যের কিউআর কোড স্ক্যান করে ভ্যাট পরিশোধ হয়েছে কি না তা যাচাই করতে পারবে। ভ্যাট ফাঁকি ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে জরিমানা আরোপ করা হবে এবং তথ্যদাতাদের পুরস্কৃত করা হবে।
এনবিআর চেয়ারম্যান আরো বলেন, প্রাথমিকভাবে পানি, পানীয়, সাবান, শ্যাম্পুসহ ভোগ্যপণ্যে এই ট্র্যাক অ্যান্ড ট্রেসিং ব্যবস্থা চালু করা হবে। পর্যায়ক্রমে সব পণ্যে এটি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। ট্রান্সফার প্রাইসিং বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ২০১৪ সালে আইন প্রণয়নের পর প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু থাকলেও দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। এ সমস্যা সমাধানে আলাদা মাস্টার ট্রান্সফার প্রাইসিং ইউনিট গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে, যা আগামী বছর থেকে কার্যকর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের একাধিকবার অগ্রিম কর (অ্যাডভান্স ট্যাক্স) পরিশোধের অভিযোগের বিষয়ে এনবিআরপ্রধান বলেন, ‘এই বিষয়টি বাস্তব এবং এটি কমানোর চেষ্টা চলছে। এরই মধ্যে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত অগ্রিম কর থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এবার তা ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে, যা বিবেচনাধীন। যাঁরা নিয়মিত কর দেন তাঁরা তুলনামূলক বেশি কর দেন, আর যাঁরা কর ফাঁকি দেন তাঁরা প্রায় কিছুই দেন না। এই বৈষম্য দূর করাই আমাদের লক্ষ্য।’
তিনি জানান, বাজার অংশীদারির ভিত্তিতে কর প্রদানের একটি বেঞ্চমার্কিং পদ্ধতি চালুর বিষয়েও কাজ চলছে, যাতে করদাতাদের মধ্যে ন্যায্যতা নিশ্চিত করা যায়। সব মিলিয়ে আসন্ন বাজেটে কর আদায় বাড়ানো, করের আওতা সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা জোরদারের ওপর জোর দেওয়া হবে বলে জানান এনবিআর চেয়ারম্যান।
ঋণখেলাপি কমিয়ে আনা প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলেন, ‘আমাদের মোট ঋণের ওয়ান-থার্ড খেলাপি হয়ে গেছে। অবশ্য এটাকে খেলাপিও বলা যায় না। এটা একটা চুরি। কোনো প্রকার নিয়ম-কানুন ছাড়াই এসব ঋণ দেওয়া হয়েছে। ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ন্যূনতম কোনো নিয়ম মানা হয়নি।’ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর যেসব কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে সেগুলোর বিষয়ে গভর্নর বলেন, ‘আগমী দু-এক সপ্তাহের মধ্যে আমরা এখানে একটা ভালো খবর দিতে পারব।’
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পাওনাদারদের বিষয়ে বলেন, এখানে যে পরিমাণ দায় তৈরি হয়েছে তা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।