প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক, নতুন সমঝোতা এবং বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের উদ্যোগ ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে।
শনিবার (২৭ জুন) জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে ‘অভূতপূর্ব সাফল্য’ উল্লেখ করে একটি ধন্যবাদ প্রস্তাব গৃহীত হয়।
প্রস্তাব উত্থাপনকালে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সফরে চীনের সঙ্গে ১৭টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর হয়েছে। পাশাপাশি বিনিয়োগ, বাণিজ্য, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও রোহিঙ্গা সংকটসহ বিভিন্ন বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতির ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, তিনি দেশের মানুষের স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করেছেন। সফরে যদি কোনো অর্জন হয়ে থাকে, সেটি বাংলাদেশের এবং দেশের মানুষের অর্জন।
ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে দায়িত্ব নেওয়ার পর ২১ থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত মালয়েশিয়া ও চীন সফর ছিল তার প্রথম সরকারি বিদেশ সফর।
মালয়েশিয়ায় যেসব বিষয়ে অগ্রগতি
মালয়েশিয়া সফরে প্রধানমন্ত্রী দেশটির কাছে আরও বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ, অনিয়মিত শ্রমিকদের বৈধতা, আটক বাংলাদেশিদের দেশে ফেরত পাঠানো এবং দ্রুত শ্রমবাজার পুনরায় চালুর অনুরোধ জানান।
দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে উচ্চশিক্ষা, ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সেমিকন্ডাক্টর শিল্প এবং হালাল অর্থনীতিতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে সম্মতি জানানো হয়।
চীন সফরে গুরুত্ব পেল অর্থনীতি ও অবকাঠামো
চীন সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের বৈঠকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডর গঠনের প্রস্তাব দেয় বেইজিং।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন, মোংলা বন্দর উন্নয়ন, শিল্প বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং কর্মসংস্থান তৈরির বিষয়েও আলোচনা হয়।
সরকার জানিয়েছে, সফরে ১৩টি সমঝোতা স্মারক ও চারটি অতিরিক্ত চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। পাশাপাশি ১৬ দফার যৌথ ঘোষণায় দুই দেশের ভবিষ্যৎ সহযোগিতার রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে।
যৌথ ঘোষণায় তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে চীনের সহায়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে প্রথমবারের মতো পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা খাতে ‘টু প্লাস টু’ কৌশলগত সংলাপ চালুর বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে।
কী বলছেন বিশ্লেষকরা?
চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমদ বলেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর চীন ও মালয়েশিয়ার শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠকই বাংলাদেশের জন্য বড় কূটনৈতিক অর্জন। এতে দুই দেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক মো. ফরিদ হোসেনের মতে, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালু হওয়া, বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডরের উদ্যোগ, তিস্তা প্রকল্পে সম্ভাব্য চীনা সম্পৃক্ততা এবং ‘টু প্লাস টু’ সংলাপ ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তবে তিনি বলেন, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের পাশাপাশি চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশ্লেষকদের মতে, সফরে নেওয়া উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন হলে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, বাণিজ্য এবং কৌশলগত সহযোগিতায় বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হতে পারে। [সূত্র: বিবিসি বাংলা]