টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় ভয়াবহ বন্যার পর পানি কমতে শুরু করলেও সামনে আসছে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বন্যা ও সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৫৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, পার্বত্য তিন জেলা, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে। কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, যোগাযোগ ও অবকাঠামো খাতে শত শত কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক হিসাব পাওয়া গেছে।
সপ্তাহজুড়ে টানা বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলের কারণে বৃহত্তর চট্টগ্রামের পাঁচ জেলা, সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারসহ বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়। বর্তমানে অনেক স্থানে পানি নামতে শুরু করলেও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ এখনো কাটেনি।
বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলার আমচাষিরা জানিয়েছেন, বাগান থেকে পানি নেমে গেলেও দীর্ঘ সময় জলাবদ্ধতায় গাছের আম বাগানেই পচে গেছে। বন্যার কারণে সময়মতো বাজারজাত করতে না পারায় তারা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন।
এদিকে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পর উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। চট্টগ্রামে পরিস্থিতির উন্নতি হলেও সিলেট ও সুনামগঞ্জে নতুন করে বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, সোমবার তিন জেলার তিনটি নদীর চারটি পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। বন্যার পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে বৃহত্তর চট্টগ্রামের পাঁচ জেলা ছাড়াও হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে কৃষি, মৎস্য, অবকাঠামো ও বসতবাড়ির ক্ষয়ক্ষতির চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার বিকেল পর্যন্ত চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ—এই সাত জেলায় বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ৫৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামেই প্রাণ হারিয়েছেন ৪৪ জন।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সাত জেলার ৫৯টি উপজেলার ৩৩৪টি ইউনিয়ন এবং ১২টি পৌর এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে পানিবন্দি হয়েছেন এক লাখ ৫৫ হাজার ৩১১টি পরিবারের সদস্য। মোট ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ছয় লাখ ৯ হাজার ৪১১ জন।
নিহতদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩১ জন কক্সবাজার জেলার বাসিন্দা। জেলার ১০টি উপজেলার ৭১টি ইউনিয়ন ও চারটি পৌরসভা প্লাবিত হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৩ জন। সেখানে ৪১৫টি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন ১৬ হাজার ৮২১ জন।
তিন পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানে পাহাড়ধস ও পাহাড়ি ঢলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বান্দরবানে ছয়জন নিহত এবং দুজন আহত হয়েছেন। জেলায় ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। রাঙামাটিতে নিহত হয়েছেন তিনজন। এছাড়া মৌলভীবাজারে একজনের মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়।
চট্টগ্রামে শত কোটি টাকার ক্ষতি
চট্টগ্রামে বন্যা ও পাহাড়ধসে ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৪ হাজার ২৮১টি বসতবাড়ি, ২১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং প্রায় এক হাজার ১৯০ কিলোমিটার সড়ক।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম জানান, জেলার ১৫টি উপজেলার ১৫৩টি ইউনিয়নে ৯ হাজার ৯৩৩টি পুকুর ও দিঘি, ৩২০টি চিংড়িঘের এবং প্রায় চার হাজার ১১২ হেক্টর জলাশয়ের মাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে মৎস্য খাতে প্রায় ৯২ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ১৭ হাজার হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতির মুখে পড়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের জেলা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আলমগীর জানান, বন্যায় ৬৫টি পোলট্রি খামার সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মারা গেছে প্রায় ৪৪ হাজার মুরগি এবং শতাধিক গরু-ছাগল। প্রায় ৫০ হাজার টন শুকনা পশুখাদ্য ও পাঁচ হাজার একর ঘাসের জমি নষ্ট হয়েছে। প্রাণিসম্পদ খাতে প্রাথমিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৮ কোটি টাকা।
বান্দরবানে যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনো স্বাভাবিক নয়
বান্দরবানে পানি কমলেও জেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধস, ভূমিধস ও পাহাড়ি ঢলে কয়েক শ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, পাহাড়ধসে পাঁচজন এবং পানিতে ভেসে এক শিশুসহ মোট ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। জেলার ২৬টি স্থানে পাহাড়ধস হয়েছে। ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ছয় হাজার ২৫০ জন আশ্রয় নিয়েছেন। প্রায় সাড়ে আট হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়েছে।
দুর্গতদের সহায়তায় জেলা প্রশাসন আট লাখ ৪০ হাজার টাকা নগদ সহায়তা দিয়েছে এবং ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। রুমা, থানচি, রোয়াংছড়ি, লামা, আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি ও সদর উপজেলার বিভিন্ন সড়ক এখনো ক্ষতিগ্রস্ত রয়েছে।
খাগড়াছড়িতে ক্ষতিগ্রস্ত হাজার হেক্টরের ফসল
বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর খাগড়াছড়িতে প্রায় এক হাজার হেক্টর জমির আমন বীজতলা, আউশ ধানের চারা ও বিভিন্ন ধরনের সবজিক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে দীঘিনালা উপজেলায়।
এছাড়া পানছড়ি উপজেলার নালকাটা-শুকনাছড়ি সড়কসহ বিভিন্ন স্থানে ভাঙন দেখা দেওয়ায় কয়েকটি সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। বহু পুকুরের মাছও ভেসে গেছে। জেলা প্রশাসক আনোয়ার সাদাত জানিয়েছেন, কৃষি, মৎস্য ও গ্রামীণ অবকাঠামোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও এখনো পূর্ণাঙ্গ হিসাব নিরূপণের কাজ চলছে।
হবিগঞ্জে ১৫০ কোটি টাকার বেশি ক্ষতি
হবিগঞ্জে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে প্রাথমিকভাবে ১৫০ কোটির বেশি টাকার ক্ষয়ক্ষতির হিসাব পাওয়া গেছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে প্রায় এক হাজার মাছের খামার ও পুকুর প্লাবিত হয়ে প্রায় ৯৫ কোটি টাকার মাছ ভেসে গেছে। প্রাণিসম্পদ খাতে প্রায় দুই লাখ ২৫ হাজার মেট্রিক টন পশুখাদ্য নষ্ট হয়েছে। এ খাতে প্রাথমিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১২ কোটি টাকা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এক হাজার ৬৪২ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় এক হাজার ২০০ কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। কৃষি খাতে প্রাথমিক ক্ষতির পরিমাণ অন্তত ২০ কোটি টাকা। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গ্রামীণ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় প্রায় ৫০ কোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
মৌলভীবাজারে কোটি টাকার মাছ ভেসে গেছে
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. আরিফ হোসেন জানিয়েছেন, আকস্মিক বন্যায় জেলার প্রায় ৪০৫টি পুকুর ও জলাশয় প্লাবিত হয়েছে। এতে বিপুল পরিমাণ মাছ ভেসে গেছে। প্রাথমিক হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ এক কোটি ১৬ লাখ টাকা।
সিলেট ও সুনামগঞ্জে বাড়ছে নদীর পানি
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, সুনামগঞ্জের ছাতক পয়েন্টে সুরমা নদীর পানি বিপৎসীমার ১৫ সেন্টিমিটার এবং মারকুলিতে কুশিয়ারা নদীর পানি বিপৎসীমার সাত সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে কুশিয়ারা নদীর পানি বিপৎসীমার ২৭ সেন্টিমিটার এবং নেত্রকোনার কমলাকান্দায় সোমেশ্বরী নদীর পানি বিপৎসীমার আট সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে।
এছাড়া যাদুকাটা, ভুসাই-কংস, তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলেও স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
আরও পাঁচ দিন বৃষ্টির পূর্বাভাস
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী পাঁচ দিন দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। আবহাওয়াবিদ শাহীনুল ইসলাম বলেন, মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় কোথাও কোথাও ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাত হতে পারে।
ত্রাণ কার্যক্রম জোরদার
বন্যাকবলিত এলাকায় প্রশাসন ও বিভিন্ন এনজিওর মাধ্যমে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। বর্তমানে এক হাজার ৪৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৩৮ হাজার ৪২২ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের শুকনা খাবার, রান্না করা খাবার ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হচ্ছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ৭ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত দেশের ৬৪ জেলায় মানবিক সহায়তা হিসেবে চাল ও নগদ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সাতটি জেলার জন্য বিশেষ বরাদ্দ হিসেবে এক কোটি ৭৫ লাখ টাকা এবং তিন হাজার ২৫০ মেট্রিক টন চাল দেওয়া হয়েছে। সারা দেশে মোট চার কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং আট হাজার ৯৫০ মেট্রিক টন চাল ত্রাণ কার্যক্রমের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
বন্যাকবলিত জেলায় স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল
বন্যাকবলিত ১১ জেলায় স্বাস্থ্যসেবা নিরবচ্ছিন্ন রাখতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল করেছে সরকার। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি উপজেলায় মেডিক্যাল টিম মোতায়েন করা হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত ৯৫ জন সাপে কাটা রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। তবে বন্যাকবলিত এলাকায় এখনো কলেরা আক্রান্তের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় ওষুধ, স্যালাইন, অ্যান্টিভেনমসহ চিকিৎসাসামগ্রী দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।