ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা হাসপাতালের ওপর নির্ভর না করে দেশের প্রতিটি নাগরিককে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
রোববার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ ড. মিল্টন হলে ডেঙ্গুর ক্লিনিক্যাল ম্যানেজমেন্ট বিষয়ক জাতীয় ট্রেনিং অব ট্রেইনার্স কার্যক্রমের প্রথম ব্যাচের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ আহ্বান জানান। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, ইউনিসেফ বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিনের সহযোগিতায় এ প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের আয়োজন করা হয়।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গু এখন আর সাধারণ কোনো রোগ নয়; এটি জাতীয় পর্যায়ের একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ সংকট মোকাবিলা করতে হলে সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং সাধারণ মানুষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো সম্ভব হলেও শতভাগ মশা বা লার্ভা ধ্বংস করা অত্যন্ত কঠিন। এডিস মশা যেকোনো ছোট ফাঁকফোকর দিয়ে ঘরে প্রবেশ করতে পারে এবং প্রায় ২০০ মিটার পর্যন্ত উড়তে সক্ষম। তাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণকে তিনি একটি ‘টোটাল ফাইট’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
মন্ত্রী বলেন, দেশের নালা-নর্দমা, ডোবা, জলাবদ্ধ স্থান, কচুরিপানাযুক্ত এলাকা এবং ঘরের আশপাশের জমে থাকা পানি পরিষ্কার না করলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির পক্ষে এ সংকট মোকাবিলা করা যাবে না; প্রয়োজন জাতীয় পর্যায়ের সমন্বিত উদ্যোগ।
ডেঙ্গুর টিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, টিকাদান কর্মসূচির বিষয়টি বিবেচনায় থাকলেও এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং বাস্তবায়নও কঠিন। ব্যাপক ভ্যাকসিনেশন চালু করতে হলে বিপুল বাজেটের প্রয়োজন হবে, যা স্বাস্থ্য খাতে বড় চাপ তৈরি করতে পারে। তাই চিকিৎসার পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাকেই বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
ডেঙ্গুর বিস্তারের কারণ হিসেবে মন্ত্রী বলেন, শহর ও গ্রামে বৃষ্টির পানি জমে থাকা ছোট ছোট স্থান এডিস মশার প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে। গ্যারেজে গাড়ি ধোয়ার পর জমে থাকা পানি, পরিত্যক্ত টায়ার, অব্যবহৃত ক্যান, রাস্তার গর্ত, বড় ড্রেন ও খালের ময়লাযুক্ত পানিতেও লার্ভার উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে।
চিকিৎসকদের উদ্দেশে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় প্লাজমা লিকেজ সময়মতো শনাক্ত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রোগীর অবস্থা কখন ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে যাচ্ছে, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
তিনি আরও জানান, বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিনের নেতৃত্বে চিকিৎসকদের আধুনিক চিকিৎসা প্রটোকল অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের চিকিৎসকদের কাছেও এই চিকিৎসা পদ্ধতির বার্তা পৌঁছে দিতে হবে। ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ নিশ্চিত করতেও সরকার কাজ করছে।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ. এম. সিদ্দিকী বলেন, ডেঙ্গু রোগীর ক্ষেত্রে প্রতি মুহূর্তে সতর্কতা জরুরি। নিয়মিত সিবিসি পরীক্ষা এবং প্লাজমা লিকেজ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে রোগীর অবস্থা মূল্যায়ন করতে হবে। প্লাজমা লিকেজ বেড়ে গেলে রোগী দ্রুত শকে চলে যেতে পারে, যা জীবনহানির ঝুঁকি তৈরি করে।
বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিনের আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনায় এবার ‘রিঅ্যাকটিভ’ নয়, বরং ‘প্রো-অ্যাকটিভ’ কৌশল নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ পরিস্থিতি বড় আকার নেওয়ার আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ইউনিসেফ বাংলাদেশের হেলথ ম্যানেজার ড. রিয়াদ মাহমুদ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. হালিমুর রশিদ এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস।