ইলন মাস্কের ‘স্পেসএক্স’ ও জেফ বেজোসের ‘ব্লু অরিজিন’সহ শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তাবিত ‘অরবিটাল বা মহাকাশ ডেটা সেন্টার’ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলে তীব্র সতর্কতা জারি করেছেন পরিবেশবাদী ও মহাকাশ বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, প্রস্তাবিত এসব ডেটা সেন্টার থেকে নির্গত বিশাল পরিমাণের দূষণ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের গঠন চিরতরে বদলে দিতে পারে। এ ঘটনার ক্ষতিকর প্রভাব মূল্যায়নে অবিলম্বে একটি নিরপেক্ষ পর্যালোচনার দাবি জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন’ (এফসিসি)-এ একটি আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।
স্যাটেলাইট ও স্ট্যাটোস্ফিয়ারে দূষণ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তির প্রসারে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো সম্মিলিতভাবে মহাকাশে লাখ লাখ ডেটা সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনা তৈরি করেছে। এগুলোর অনুমোদনের জন্য তারা এফসিসির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
তবে মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠানো এবং মেয়াদ শেষে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে পুনঃপ্রবেশের সময় পুড়ে যাওয়ার ফলে যে দূষণ ঘটছে, তা স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে বা বায়ুমণ্ডলের দ্বিতীয় স্তরে বিপজ্জনক হারে জমা হচ্ছে। এসব মহাকাশযান ব্ল্যাক কার্বন, বিরল ধাতু, অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, পারদ ও ক্লোরিন গ্যাসের মতো বিপজ্জনক উপাদান নির্গমন করে, যা বায়ুমণ্ডলের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, এই নতুন ধরনের বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ ওজোনের স্তর ধ্বংস করতে পারে। এর ফলে মানবজাতি ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মির সরাসরি ঝুঁকিতে পড়বে এবং বৈশ্বিক জলবায়ু সংকট আরো তীব্র হয়ে উঠবে। এ ছাড়া লাখ লাখ স্যাটেলাইটের আলোর কারণে কৃত্রিম আলোকদূষণ নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে, যা জোনাকি পোকাসহ নানা কীটপতঙ্গ ও প্রাণীর অস্তিত্বের জন্য হুমকি।
লাইসেন্স স্থগিতের আবেদন
পরিবেশবাদী ও আইনি সংস্থা ‘পাবলিক এমপ্লয়িজ ফর এনভায়রনমেন্টাল রেসপন্সিবিলিটি’ (পিয়ার), ‘আর্থজাস্টিস’ এবং ‘ডার্কস্কাই ইন্টারন্যাশনাল’ যৌথভাবে এফসিসিতে এই পিটিশন বা আবেদনটি দাখিল করেছে।
আবেদনে নতুন মহাকাশ ডেটা সেন্টার প্রকল্পের লাইসেন্স দেওয়া স্থগিত রাখার আহ্বান জানিয়ে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তাবিত এসব পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। ডেটা সেন্টার নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের মহাকাশ পরিকল্পনার কথা বড় করে প্রচার করলেও, বায়ুমণ্ডল, জলবায়ু ও অর্থনীতির ওপর এসবের মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে তারা একেবারেই নিরব।
বিশেষজ্ঞ ও সাবেক কর্মকর্তাদের উদ্বেগ
মার্কিন সংস্থা ‘ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ (নোয়া)-এর স্যাটেলাইট অফিসের সাবেক প্রধান স্টিভ ভোলজ জানান, এসব স্যাটেলাইটে প্রচুর জটিল ও ক্ষতিকর পদার্থ রয়েছে। সেগুলো বায়ুমণ্ডলে পুড়ে গেলেও যেমন ধোঁয়া নির্গত হয়, ঠিক তেমনি ক্ষতিকর বর্জ্য বাতাসকে বিষাক্ত করে তোলে।
নোয়ার সাবেক মহাকাশ নীতি বিশেষজ্ঞ ও ‘স্ট্যান্ড আপ ফর সায়েন্স’-এর কর্মী কোল ডোনোভান জানান, মহাকাশ ডেটা সেন্টারের জন্য বিপুল পরিমাণ দুর্লভ ধাতু ও সম্পদের প্রয়োজন হবে। এতে পৃথিবীতেও নতুন পরিবেশগত সংকট তৈরি হবে।
২০১৫ সালে যেখানে সক্রিয় স্যাটেলাইটের সংখ্যা ছিল প্রায় ১ হাজার ৪০০, বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫ হাজারে।
ধারণা করা হচ্ছে, পরবর্তী এক দশকের মধ্যে কেবল ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের জন্য পাঠানো স্পেসএক্সের ‘স্টারলিঙ্ক’ এবং আমাজনের ‘মেগা কনস্টেলেশন’-এর মতো প্রকল্পের অধীনেই ১ লাখেরও বেশি স্যাটেলাইট মহাকাশে অবস্থান করবে।
এফসিসির কাছে আইনি প্রশ্ন ও কোম্পানির অস্পষ্টতা
পিটিশনে উল্লেখ করা হয়, ‘ন্যাশনাল এনভায়রনমেন্টাল পলিসি অ্যাক্ট’ (নেপা) অনুযায়ী এফসিসি যেকোনো প্রকল্প অনুমোদনের আগে তার পরিবেশগত প্রভাব খতিয়ে দেখতে বাধ্য।
মহাকাশে ২০ হাজার স্যাটেলাইটভিত্তিক পাওয়ার গ্রিড স্থাপনের আবেদনকারী ‘কাউবয় স্পেস কর্পোরেশন’ পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়ে শুধুমাত্র জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের ওপর প্রভাব কমানোর অস্পষ্ট আশ্বাস দিয়েছে। অন্যদিকে স্পেসএক্স তাদের আবেদনে উজ্জ্বলতা কমানোর প্রযুক্তি তৈরির কথা বললেও, সামগ্রিক পরিবেশগত ক্ষতির কোনো সমাধান বা সুস্পষ্ট ব্যাখায় যায়নি।
পরিবেশবাদী দলগুলোর দাবি, বায়ুমণ্ডলে কোটি কোটি স্যাটেলাইটের তৈরি ধোঁয়া, সংঘর্ষ ও ধ্বংসাবশেষের সম্মিলিত ক্ষতি কীভাবে রোধ করা হবে, তার কোনো সন্তোষজনক পরিকল্পনা এখনো কোনো কোম্পানি উপস্থাপন করতে পারেনি।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান