বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক আলোচনায় ভারত-সম্পর্ক ও সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলেও, দেশের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক, অস্থির ও সরাসরি নিরাপত্তা হুমকি আসলে মিয়ানমার সীমান্ত থেকেই তৈরি হচ্ছে। দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে দেশের নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে সরাসরি হুমকিগুলোর একটি এখন মিয়ানমার। রোহিঙ্গা সংকট, রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির দ্রুত অগ্রযাত্রা এবং বারবার বাংলাদেশের ভূখণ্ড ও আকাশসীমা লঙ্ঘনের ঘটনা সেই ঝুঁকিকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
এই প্রেক্ষাপটে সৌদি নেতৃত্বাধীন ‘মক্কা প্যাক্ট’ বাংলাদেশের সামনে একটি বিকল্প নিরাপত্তা কাঠামোর সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থান কীভাবে বিকল্প নিরাপত্তা কাঠামোর মাধ্যমে বদলে যেতে পারে, তা বিশ্লেষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখা যেতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গা মানবিক সংকটের স্থায়ী সমাধানে ঢাকা প্রচলিত কূটনৈতিক চ্যানেল এবং আঞ্চলিক প্রতিবেশীদের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করেছে। কিন্তু রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে ভারতের সহায়তা ছিল সীমিত। একই সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন ও নিজস্ব সামরিক শিল্প সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও ভারতের প্রভাব একটি কৌশলগত সীমারেখা তৈরি করেছে। আর এই অসম ভারসাম্য মিয়ানমারের সামরিক জান্তাকে কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। ফলে কোনো কার্যকর সামরিক বা কৌশলগত প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা ছাড়াই তারা লাখ লাখ মানুষকে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ঠেলে দিতে পেরেছে।
মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর ধারাবাহিক পরাজয় এবং রাখাইন রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকায় আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ফলে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। মিয়ানমার বাংলাদেশের জন্য একটি ধারাবাহিক নিরাপত্তা ঝুঁকি। একটি বৈরী বা উদাসীন সামরিক জান্তার সঙ্গে কেবল প্রচলিত কূটনীতি কিংবা দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ওপর নির্ভর করে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা এখন আর যথেষ্ট নয়।
মক্কা প্যাক্টের মতো একটি সম্মিলিত প্রতিরক্ষা কাঠামোর সঙ্গে বাংলাদেশ যুক্ত হলে এই শক্তির ভারসাম্য বাংলাদেশের স্বার্থই রক্ষা করবে। এ ধরনের জোটে অংশগ্রহণ বাংলাদেশের নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির গতিও ত্বরান্বিত করতে পারে। এর মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট আঞ্চলিক শক্তির ওপর দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা-নির্ভরতা কমিয়ে সামরিক উৎপাদন ও প্রযুক্তিতে আত্মনির্ভরতার সুযোগ তৈরি হতে পারে। মক্কা প্যাক্টের মতো শক্তিশালী প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বে যুক্ত হওয়া বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত সুবিধা দেবে এবং রোহিঙ্গা সংকটের একটি টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ সমাধানের জন্য ঢাকার কূটনৈতিক ও কৌশলগত দর-কষাকষির ক্ষমতাও বাড়াতে পারে।