আজ জিলকদ মাসের ২৮ তারিখ। আগামীকালই হতে পারে জিলকদ মাসের শেষ দিন। এ সময়টি প্রতিটি মুমিনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই সময় থেকেই জিলহজ মাসের গুরুত্বপূর্ণ আমল শুরু হয়ে।
আমরা জানি, কোরবানি একটি আর্থিক ইবাদত। ১০ থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে কারো কাছে নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলেই তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব; যার বিনিময়ে মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের অগণিত সওয়াব প্রদানের ঘোষণা দিয়েছেন। তাই কারো কারো মনে হতে পারে, এটি শুধু ধনীদের ঈদ। আর্থিকভাবে অসচ্ছলরা তো কোরবানি দেওয়ার সামর্থ্য রাখে না।
তারা এই সওয়াব কিভাবে অর্জন করবে? মহান আল্লাহ এতটাই দয়ালু যে তিনি ধনী-গরিব সবার জন্যই কোরবানির সওয়াব লাভের সুব্যবস্থা রেখেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) উম্মতকে জিলহজ মাসের চাঁদ ওঠার আগ থেকে প্রস্তুতি নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন। যদি কেউ সে অনুযায়ী আমল করে, তবে সেও কোরবানির পূর্ণ বরকত অর্জন করতে পারবে। তা হলো, জিলহজের চাঁদ দেখার পর থেকে কোরবানির আগ পর্যন্ত নিজের নখ, চুল, গোঁফ, নাভির নিচের পশম ইত্যাদি কাটা থেকে বিরত থাকা।
হজরত উম্মে সালমা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা যদি জিলহজ মাসের চাঁদ দেখতে পাও আর তোমাদের কেউ কোরবানি করার ইচ্ছা করে, তবে সে যেন স্বীয় চুল ও নখ কাটা থেকে বিরত থাকে।’ (মুসলিম, হাদিস : ১৯৭৭)
যারা কোরবানি করতে সক্ষম নয় তারাও এই আমল পালন করতে পারে। অর্থাত্ নিজের চুল, নখ, গোঁফ ইত্যাদি কাটা থেকে বিরত থাকবে। কেননা কোনো অসচ্ছল লোক যদি এ দিনগুলোতে চুল, নখ, গোঁফ ইত্যাদি না কেটে ঈদের দিন কাটে, তবে তাদের পূর্ণ কোরবানির সওয়াব দেওয়া হবে। সুবহানাল্লাহ! এটা আমাদের কথা নয়, বরং এটা সর্বশ্রেষ্ঠ নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর কথা। হাদিস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, আমি কোরবানির দিন সম্পর্কে আদিষ্ট হয়েছি (অর্থাত্ এই দিনে কোরবানি করার আদেশ করা হয়েছে।) আল্লাহ তাআলা তা এ উম্মতের জন্য ঈদ হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। এক ব্যক্তি আরজ করল, হে আল্লাহর রাসুল, যদি আমার কাছে শুধু একটি মানিহা থাকে অর্থাত্ যা শুধু দুধপানের জন্য দেওয়া হয়েছে? আল্লাহর রাসুল (সা.) বললেন, না; বরং সেদিন তুমি তোমার চুল কাটবে, নখ কাটবে, গোঁফ ও নাভির নিচের পশম পরিষ্কার করবে। এটিই আল্লাহর কাছে তোমার পূর্ণ কোরবানি বলে গণ্য হবে। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ৬৫৭৫)
উক্ত হাদিসে রাসুল (সা.) কোরবানি করতে অসক্ষম ব্যক্তিরাও যেন সচ্ছল মুসলমানদের সঙ্গে কোরবানির ঈদের পরিপূর্ণ ফজিলত অর্জন করতে পারে, সেই রাস্তা বাতলে দিয়েছেন। অনুরূপভাবে হাজিদের সাদৃশ্য অবলম্বনকারী হবে। মহান আল্লাহ এতটাই মহান যে তিনি তাঁর কোনো বান্দাকেই নৈরাশ করেননি। অর্থ-সম্পদ না থাকলেও ধনীদের সমপরিমাণ সওয়াব অর্জনের জন্য বিকল্প রাস্তা রেখে দিয়েছেন।
অনেক ক্ষেত্রে মানুষের ইখলাস ও নিয়তের বিশুদ্ধতার কারণেই সে এমন আমলের সওয়াব পেয়ে যায়, যা করার সামর্থ তার ছিল না। হাদিস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, আবু কাবশা আল-আনমারী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, এ উম্মতের দৃষ্টান্ত চার ব্যক্তি সদৃশ। (১) এক ব্যক্তিকে আল্লাহ ধন-সম্পদ ও জ্ঞান দান করেছেন এবং সে তার জ্ঞান দ্বারা তার মাল ব্যবহার করে, যথার্থ খাতে তা ব্যয় করে। (২) এক ব্যক্তিকে আল্লাহ জ্ঞান দান করেছেন কিন্তু সম্পদ দান করেননি। সে বলে, ঐ ব্যক্তির অনুরূপ আমার সম্পদ থাকলে আমি তার মত তা কাজে লাগাতাম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, এ দু’জন সমান পুরস্কার লাভের অধিকারী। (৩) এক ব্যক্তিকে আল্লাহ সম্পদ দান করেছেন, কিন্তু জ্ঞান দান করেননি। সে তার মালে ভ্রান্তনীতি গ্রহণ করে, তা অন্যায় পথে ব্যয় করে। (৪) এক ব্যক্তিকে আল্লাহ জ্ঞান ও সম্পদ কোনটাই দান করেননি। সে বলে, তার অনুরূপ আমার সম্পদ থাকলে তার মত (ভ্রান্ত) কাজে লাগাতাম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, এই দুই ব্যক্তি সমান অপরাধী। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪২২৮)
অতএব, মুমিনের উচিত, তার সাধ্য অনুযায়ী মহান আল্লাহকে খুশি রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা।