পারিবারিক সহিংসতার বিচার চাইতে আদালতে পৌঁছানোর আগেই নানা বাধার মুখে পড়েন পাকিস্তানের নারীরা। কখনো পুলিশের অনীহা, কখনো অভিযোগের সত্যতা নিয়ে সন্দেহ, আবার কখনো ঘরের ভেতরের সহিংসতাকে ‘পারিবারিক বিষয়’ হিসেবে দেখার প্রবণতা তাদের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে।
দীর্ঘদিনের এই বাস্তবতা সম্প্রতি সামনে এনেছে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট। গত ১৪ সেপ্টেম্বর দেওয়া এক রায়ে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত বলেছে, নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে শুধু সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; পুলিশের তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়াতেও লিঙ্গসংবেদনশীল দৃষ্টিভঙ্গি নিশ্চিত করতে হবে।
বিচারপতি মুহাম্মদ হাশিম খান কাকারের নেতৃত্বাধীন দুই বিচারপতির বেঞ্চ রায়ে বলেন, নারীর ওপর নির্যাতনের ঘটনা মোকাবিলায় পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে বিদ্যমান পিতৃতান্ত্রিক ও লিঙ্গবৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি দূর করতে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি।
একটি পারিবারিক হত্যাকাণ্ডের মামলার সূত্রে দেওয়া এই পর্যবেক্ষণের তাৎপর্য নির্দিষ্ট মামলার গণ্ডি ছাড়িয়ে গেছে। রায়টি এমন এক দীর্ঘদিনের সামাজিক প্রবণতাকে চ্যালেঞ্জ করেছে, যেখানে লোকলজ্জা ও পারিবারিক গোপনীয়তার অজুহাতে ঘরের ভেতরে সংঘটিত সহিংসতাকে বিচারপ্রক্রিয়ার বাইরে রাখার চেষ্টা করা হয়।
সুপ্রিম কোর্ট পর্যবেক্ষণ করেছে, পারিবারিক হত্যাকাণ্ডের ট্র্যাজেডি শুধু এই নয় যে একজন নারী নিজের ঘরেই হত্যার শিকার হয়েছেন; বরং ঘটনার পারিপার্শ্বিক তথ্য ও গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণও ওই চার দেয়ালের মধ্যে গোপন থেকে যেতে পারে। আদালত জোর দিয়ে বলেছে, বৈবাহিক সম্পর্কের গোপনীয়তা যেন অপরাধীর দায় এড়ানোর ঢাল হয়ে না ওঠে, তা নিশ্চিত করা বিচারব্যবস্থার দায়িত্ব।
প্রমাণ সংগ্রহে বড় চ্যালেঞ্জ
সাধারণ অপরাধের তুলনায় পারিবারিক সহিংসতার ঘটনায় নিরপেক্ষ প্রত্যক্ষদর্শী পাওয়া কঠিন। পরিবারের সদস্যরা অনেক সময় ভয়, সামাজিক চাপ কিংবা সম্পর্কের টানাপোড়েনের কারণে সাক্ষ্য দিতে চান না। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ আলামত ও প্রমাণ নষ্ট করে ফেলার আশঙ্কাও থাকে।
এ পরিস্থিতিতে তদন্ত কর্মকর্তাকে সামাজিক ধারণা বা প্রচলিত বিশ্বাসের ওপর নির্ভর না করে পারিপার্শ্বিক প্রমাণ বিশ্লেষণের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত চিত্র পুনর্গঠন করতে হয়। বিশেষ করে ভুক্তভোগী মারা গেলে বা বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ না থাকলে নিরপেক্ষ ও পেশাদার তদন্তের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।
জাতিসংঘের সংস্থা ইউএন উইমেনের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানে ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী বিবাহিত নারীদের ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ জীবনে অন্তত একবার স্বামীর শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এ পরিসংখ্যান দেশটিতে নারীর প্রতি সহিংসতার ব্যাপকতা তুলে ধরে।
হিউম্যান রাইটস কমিশন অব পাকিস্তানের (এইচআরসিপি) ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তথাকথিত ‘অনার কিলিং’ বা সম্মানের নামে সংঘটিত সহিংসতায় অন্তত ৪৭০ জন নারী প্রাণ হারিয়েছেন। এ ছাড়া ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের পার্লামেন্টের জেন্ডার মেইনস্ট্রিমিং-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটি নারী ও কন্যাশিশুদের প্রতি সহিংসতা বৃদ্ধিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে। একই সঙ্গে তদন্তে পুলিশের অবহেলা ও বিলম্বের সমালোচনা করে কমিটি।
আইন আছে, কার্যকর প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন
পাকিস্তানে পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে আইনগত কাঠামো থাকলেও সেগুলোর কার্যকর প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ২০১২ সালের পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষাসংক্রান্ত আইনের পাশাপাশি পাঞ্জাব, সিন্ধ, খাইবার পাখতুনখাওয়া ও বেলুচিস্তানে পৃথক প্রাদেশিক আইন রয়েছে।
দেশটিতে অন্তত ৪৮০টি বিশেষায়িত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা আদালত রয়েছে। ২০২৩ সালেই এসব আদালতে প্রায় ৪৮ হাজার নতুন মামলা দায়ের হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে আইন ও বিশেষায়িত আদালত থাকা সত্ত্বেও তদন্ত পর্যায়ে পিতৃতান্ত্রিক মনোভাব, অবহেলা এবং প্রমাণ সংগ্রহে ব্যর্থতা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে থাকছে।
বিচার বিভাগেও নারীর প্রতিনিধিত্ব কম
তদন্ত ব্যবস্থার পাশাপাশি পাকিস্তানের বিচার বিভাগেও নারীর সীমিত প্রতিনিধিত্ব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ল অ্যান্ড জাস্টিস কমিশন অব পাকিস্তানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির মোট ৩ হাজার ১৪২ জন বিচারক ও বিচারিক কর্মকর্তার মধ্যে নারী মাত্র ১৮ শতাংশ। সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টগুলোর উচ্চপর্যায়ের ১২৬ জন বিচারকের মধ্যে নারী মাত্র সাতজন, যা মোট সংখ্যার ৫ দশমিক ৫ শতাংশ।
পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের প্রথম নারী বিচারপতি আয়েশা মালিক ২০২৫ সালে এক বক্তব্যে বিচার বিভাগে নারীর স্বল্প প্রতিনিধিত্ব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশটিতে নারী আইনজীবীর সংখ্যা ২৫ থেকে ২৬ শতাংশ হলেও বিচারক পদে তাদের উপস্থিতি প্রায় ২ শতাংশের কাছাকাছি। এ পরিস্থিতি আইনি ব্যবস্থায় পুরুষকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় থাকার আশঙ্কা বাড়ায়।
ভুক্তভোগীর চরিত্র নয়, গুরুত্ব পেতে হবে অপরাধের
আইনি প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গিও নারীর ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সহিংসতার শিকার নারীর চরিত্র, পোশাক কিংবা আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলে অনেক সময় অপরাধের গুরুত্ব কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করা হয়। এতে ভুক্তভোগীর ওপরই দায় চাপানোর প্রবণতা তৈরি হয় এবং অপরাধীর জবাবদিহি আড়ালে পড়ে যায়।
পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের রায়ে এ ধরনের প্রবণতার বিরোধিতা করে বলা হয়েছে, বৈবাহিক সম্পর্ক কিংবা পারিবারিক সম্মানের অজুহাতে সহিংসতার তদন্তে শিথিলতা দেখানোর সুযোগ নেই।
আদালতের এই পর্যবেক্ষণ পাকিস্তানে নারীর প্রতি সহিংসতা মোকাবিলায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও বিচার বিভাগের দায়িত্ব নতুন করে সামনে এনেছে। আইন প্রণয়ন ও বিশেষায়িত আদালত প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি তদন্ত কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ, প্রমাণ সংরক্ষণ, সাক্ষীদের নিরাপত্তা এবং লিঙ্গসংবেদনশীল বিচারপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে আদালতের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানোর আগেই ন্যায়বিচারের পথ থেকে ছিটকে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবেন সহিংসতার শিকার বহু নারী।