মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং যুক্তরাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে দেশটি থেকে নিজেদের সব বোমারু বিমান সরিয়ে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বিমানগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নিজ নিজ স্থায়ী ঘাঁটিতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।
রবিবার (৪ অক্টোবর) এক বিবৃতিতে তিনি এ তথ্য জানান। তবে আকস্মিক এ সিদ্ধান্তের সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি পেন্টাগন।
যুক্তরাজ্যের গ্লুচেস্টারশায়ারে অবস্থিত আরএএফ ফেয়ারফোর্ড দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক তৎপরতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিশেষ করে বি-৫২সহ দূরপাল্লার মার্কিন বোমারু বিমান পরিচালনায় ঘাঁটিটির কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। ফলে সেখান থেকে সব বোমারু বিমান প্রত্যাহারের ঘটনায় ঘাঁটির নিরাপত্তা এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরিকল্পনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিমান প্রত্যাহারের সঙ্গে গত ২৭ সেপ্টেম্বর ঘাঁটির কাছে ঘটে যাওয়া একটি নিরাপত্তা ঘটনার যোগসূত্র থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ওই দিন বিমানঘাঁটির আশপাশে তিনটি সন্দেহজনক যানবাহনের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার পর পুলিশকে সতর্ক করা হয়।
সম্ভাব্য নাশকতা বা সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনার সন্দেহে অভিযান চালিয়ে ২৩ থেকে ২৫ বছর বয়সী পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে ব্রিটিশ পুলিশ। তারা সবাই যুক্তরাজ্যের নাগরিক ও লন্ডনের বাসিন্দা। পরে এ ঘটনায় আরও একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২৫ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি যুক্তরাজ্য ও ইরানের দ্বৈত নাগরিক বলে জানা গেছে। তবে গ্রেপ্তার ছয়জনকেই পরবর্তী সময়ে পুলিশি জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়।
ঘাঁটির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই বিমান প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত আসে। হোয়াইটহলের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোও এ ঘটনার সঙ্গে ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য যোগসূত্র নাকচ করেনি।
তবে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিমান প্রত্যাহার কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল না। বরং সম্ভাব্য অভিযানিক ঝুঁকি বিবেচনায় মার্কিন সামরিক বাহিনী নিজস্ব মূল্যায়নের ভিত্তিতে এ পদক্ষেপ নেয় এবং বিষয়টি ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষকে জানায়।
এদিকে ঘাঁটির কাছে সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডের ঘটনায় ইরানের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। তাঁর ভাষ্য, এ ঘটনায় ইরানের সরাসরি ভূমিকার পক্ষে জোরালো আলামত ও ইঙ্গিত রয়েছে। তবে অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জামিনে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ ঘটনায় বিস্ময় ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, সন্দেহভাজনদের জামিনে মুক্তি দেওয়ার ঘটনায় তিনি ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত বিস্মিত। তাঁর দাবি, অভিযুক্তদের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য রয়েছে এবং তারা মার্কিন কর্তৃপক্ষের এখতিয়ারে থাকলে কাউকে মুক্তি দেওয়া হতো না।
একই ধরনের উদ্বেগ জানিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এ ষড়যন্ত্রের পেছনে স্পষ্টতই কোনো শক্তিশালী বিদেশি শক্তির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। সংবেদনশীল তথ্যের কথা উল্লেখ করে বিস্তারিত জানাতে অস্বীকৃতি জানালেও ঘটনাটিকে বড় ধরনের রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।
সাম্প্রতিক সময়ে ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা বাড়ায় আরএএফ ফেয়ারফোর্ডের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক সামরিক অভিযান পরিচালনায় যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধে যুক্তরাজ্যের সম্মতির পর এ ঘাঁটি থেকে মার্কিন বোমারু বিমান মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশে উড্ডয়ন করছিল।
এমন পরিস্থিতিতে গত জুলাইয়ে তেহরান হুঁশিয়ারি দিয়েছিল, ইরানের ভূখণ্ড বা স্বার্থের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত যেকোনো বিদেশি সামরিক ঘাঁটি দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচিত হবে।
সব মিলিয়ে, আরএএফ ফেয়ারফোর্ড থেকে মার্কিন বোমারু বিমান প্রত্যাহারের ঘটনা ঘাঁটির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থান ও আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটেও নতুন তাৎপর্য পেয়েছে।
সূত্র: বিবিসি