বাংলাদেশের বহুল আলোচিত ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) প্রকল্পে ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম, ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার ঘাটতি এবং কারিগরি সীমাবদ্ধতার অভিযোগ নতুন করে সামনে এসেছে। সরকারের মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যে উঠে এসেছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরিকল্পনা থেকে প্রয়োগ পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে গুরুতর প্রশ্ন রয়ে গেছে।
উচ্চমূল্যে ক্রয় ও আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ইভিএম প্রকল্পে প্রতিটি মেশিনের ক্রয়মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৩৪ হাজার টাকার বেশি, যা আন্তর্জাতিক বাজারদরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি বলে দাবি করা হচ্ছে। সিএজি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাজারদরের তুলনায় অনেক বেশি দামে এসব যন্ত্র কেনার ফলে রাষ্ট্রের হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ক্রয় প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, প্রচলিত টেন্ডার প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই তড়িঘড়ি করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির (বিএমটিএফ) মাধ্যমে যন্ত্র সংগ্রহ করা হলেও পুরো প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের স্বচ্ছতা ছিল না বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
ওয়ারেন্টি ও রক্ষণাবেক্ষণে দুর্বলতা
পরিকল্পনা পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি ওয়ারেন্টির কথা থাকলেও বাস্তবে সীমিত সময়ের জন্য চুক্তি করা হয়। ফলে বর্তমানে বিপুল সংখ্যক ইভিএম অচল বা মেরামতের অপেক্ষায় রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রায় দেড় লাখ মেশিনের একটি বড় অংশ কার্যকারিতা হারিয়েছে।
কারিগরি সীমাবদ্ধতা ও আস্থার সংকট
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইভিএম ব্যবস্থায় ভিভিপিএটি (VVPAT) বা কাগজভিত্তিক যাচাইকরণ ব্যবস্থা না থাকায় ভোটের স্বচ্ছতা ও পুনর্গণনা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এ কারণে নির্বাচন-পরবর্তী নিরীক্ষা বা যাচাই প্রক্রিয়া জটিল হয়ে পড়ে।
অভিযুক্তদের তালিকা (অভিযোগ অনুযায়ী)
অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই প্রকল্পে অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে পাঁচজন প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে। তারা হলেন:
তারিক আহমেদ সিদ্দিক – সাবেক প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা
হেলালুদ্দীন আহমদ – সাবেক নির্বাচন কমিশন সচিব
শাহাদাত হোসেন চৌধুরী – সাবেক নির্বাচন কমিশনার
মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম – সাবেক মহাপরিচালক, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) অনুবিভাগ
সুলতানুজ্জামান মুহাম্মদ সালেহ উদ্দিন – সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি (বিএমটিএফ)
উল্লেখ্য, এসব অভিযোগ সংশ্লিষ্ট তদন্তের আওতায় রয়েছে এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বিষয়টি নির্ধারিত হবে।
তদন্ত ও আইনগত পদক্ষেপ
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতোমধ্যে ইভিএম সরবরাহ ও মান নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু করেছে। সাম্প্রতিক এক অভিযানে পরীক্ষার জন্য নেওয়া কিছু মেশিনের মধ্যে ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্র পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ ব্যবহার
ইভিএম প্রকল্পটি শুরু থেকেই রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এর বিরোধিতা করে আসলেও নির্দিষ্ট কিছু নির্বাচনে সীমিত পরিসরে এটি ব্যবহার করা হয়। তবে বর্তমান নির্বাচন কমিশন ভবিষ্যতে ইভিএম ব্যবহারের বিষয়ে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে জানা গেছে।
জনমনে প্রতিক্রিয়া
বিষয়টি সামনে আসার পর জনমনে উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। করদাতাদের অর্থের যথাযথ ব্যবহার ও দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জোরালো হচ্ছে।