ঢাকার স্কুলপড়ুয়া শিশুদের মধ্যে ডিজিটাল স্ক্রিন ব্যবহারের মাত্রা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। মোবাইল ফোন, টিভি, ট্যাব ও কম্পিউটারের মতো ডিভাইসে অতিরিক্ত সময় কাটানোর ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে উঠে এসেছে নতুন এক গবেষণায়।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার শিশুদের একটি বড় অংশ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫ ঘণ্টা স্ক্রিনে সময় ব্যয় করে। এর ফলে ঘুম কমে যাওয়া, ওজন বৃদ্ধি, মাথাব্যথা, চোখের সমস্যা এবং মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব দেখা দিচ্ছে।
গবেষণাটি দুই বছর ধরে ঢাকার ছয়টি স্কুলের ৪২০ জন শিক্ষার্থীর ওপর পরিচালিত হয়। এর ফলাফল ৪ মে জার্নাল অব মেডিক্যাল ইন্টারনেট রিসার্চ (JMIR) হিউম্যান ফ্যাক্টরস-এ প্রকাশিত হয়েছে।
আইসিডিডিআরবির পাঁচজন এবং ঢাকার টেলি সাইকিয়াট্রি রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন নেটওয়ার্কের একজন গবেষক এতে যুক্ত ছিলেন।
গবেষণার প্রধান গবেষক ও আইসিডিডিআরবির সহকারী বিজ্ঞানী শাহরিয়া হাফিজ কাকন প্রথম আলোকে বলেন, শিশুদের দেরিতে ঘুমানো, মাথাব্যথা, চোখের অস্বস্তি, খিটখিটে মেজাজ, নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া, বাইরের খেলাধুলায় অনীহা ও মনোযোগ কমে যাওয়ার মতো লক্ষণগুলো উপেক্ষা করা উচিত নয়।
গবেষণা প্রবন্ধে বলা হয়েছে, ডিজিটাল ডিভাইস সহজলভ্য হওয়ায় তা শিশুদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে। শিক্ষা ও বিনোদনের জন্য স্ক্রিন ব্যবহার স্বাভাবিক হলেও অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার জনস্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি করছে।
গবেষণায় দেখা যায়, প্রতি পাঁচজন শিশুর মধ্যে প্রায় দুজন দুশ্চিন্তা, অতিচঞ্চলতা বা আচরণগত সমস্যায় ভুগছে। অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিশুদের নিষ্ক্রিয় জীবনযাপন বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের চাইল্ড, অ্যাডোলেসেন্ট অ্যান্ড ফ্যামিলি সাইকিয়াট্রি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুহাম্মদ শিবলি সাদিক বলেন, এটি বৈশ্বিক সমস্যা হলেও বাংলাদেশের জন্য গবেষণাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, শিশুদের স্ক্রিন টাইম ১ থেকে ২ ঘণ্টার মধ্যে সীমিত রাখা উচিত।
২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশনের ছয়টি স্কুলে গবেষণা চালানো হয়। এর মধ্যে তিনটি ছিল ইংরেজি মাধ্যম এবং তিনটি বাংলা মাধ্যম। ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী দ্বিতীয় থেকে অষ্টম শ্রেণির ৪২০ জন শিক্ষার্থী এতে অংশ নেয়।
গবেষণায় মানসিক সমস্যা রয়েছে এমন শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। প্রশিক্ষিত গবেষণা সহকারী ও একজন পরিদর্শক শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করেন।
শিশুদের স্ক্রিন ব্যবহার, ঘুম, ওজন এবং আচরণ পর্যবেক্ষণ করে তথ্য বিশ্লেষণ করা হয় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে।
গবেষণায় দেখা যায়, ৮৩ শতাংশ শিশু প্রতিদিন দুই ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন ব্যবহার করে, যা আন্তর্জাতিক সুপারিশকৃত সীমার চেয়ে বেশি। গড়ে শিশুরা দিনে ৪.৬ ঘণ্টা স্ক্রিনে থাকে।
এক-তৃতীয়াংশের বেশি শিশু চোখের সমস্যায় এবং প্রায় ৮০ শতাংশ শিশু ঘন ঘন মাথাব্যথায় ভোগে। যারা বেশি স্ক্রিন ব্যবহার করে, তারা গড়ে মাত্র ৭.৩ ঘণ্টা ঘুমায়, যেখানে প্রয়োজন ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা।
প্রায় ১৪ শতাংশ শিশু অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতায় আক্রান্ত, এবং স্ক্রিন ব্যবহারকারীদের মধ্যে এই হার বেশি।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, প্রতি পাঁচজন শিশুর মধ্যে প্রায় দুজন দুশ্চিন্তা, অতিচঞ্চলতা বা আচরণগত সমস্যায় ভুগছে।
গবেষকেরা বলেন, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার ঘুমের চক্র ব্যাহত করে, শারীরিক কার্যক্রম কমায়, স্থূলতা বাড়ায় এবং সামাজিক যোগাযোগ কমিয়ে মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
গবেষকেরা জানান, আন্তর্জাতিক গবেষণাও একই ধরনের ফল দেখিয়েছে—অপর্যাপ্ত ঘুম, স্থূলতা, উদ্বেগ এবং শিক্ষাগত দুর্বলতার সঙ্গে অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের সম্পর্ক রয়েছে।
প্রধান গবেষক শাহরিয়া হাফিজ কাকন বলেন, কোভিডের সময় শিক্ষার প্রয়োজনে মোবাইল ব্যবহার শুরু হলেও পরে তা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। মাঠের অভাব ও অভিভাবকদের নিজেদের দীর্ঘ স্ক্রিন ব্যবহারের অভ্যাসও এতে ভূমিকা রাখছে।
করণীয় কী
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের চোখের সুরক্ষায় ‘২০-২০-২০’ নিয়ম মানা উচিত—প্রতি ২০ মিনিট পর ২০ সেকেন্ড ২০ ফুট দূরের দিকে তাকানো।
আইসিডিডিআরবির নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ বলেন, শিশুদের স্ক্রিন টাইম দিনে দুই ঘণ্টার মধ্যে সীমিত রাখা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, বাইরের খেলাধুলা, পর্যাপ্ত ঘুম, পারিবারিক সময় এবং সৃজনশীল কাজে শিশুদের যুক্ত করা প্রয়োজন। প্রযুক্তি বন্ধ নয়, বরং ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করাই সমাধান।