পর্যটন শহর কক্সবাজারে নির্মাণ হচ্ছে আধুনিক মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র। যেখানে এক ছাদের নিচে মিলবে মাছ খালাস, সংরক্ষণ, প্যাকেজিং ও বাজারজাতকরণের আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা। দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সংকট কাটিয়ে এই প্রকল্প ঘিরে নতুন আশায় বুক বাঁধছেন মৎস্য খাতে জড়িত জেলে, ট্রলার মালিক, শ্রমিক ও মৎস্য ব্যবসায়ীরা। নতুন এই মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র নির্মিত হলে প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে ২ লাখ মানুষ উপকৃত হবে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামোগত সংকট, ছোট জেটি, অপরিকল্পিত উপায়ে মাছ খালাস ও সংরক্ষণসহ নানা সমস্যায় ভুগছিল কক্সবাজারের মৎস্যখাতে জড়িতরা। বিশেষ করে গভীর সমুদ্র থেকে আনা মাছ দ্রুত বাজারজাত করতে না পারায় লোকসানের মুখে পড়তেন জেলে থেকে শুরু করে মৎস্য ব্যবসায়ীরা। এসব সংকট কাটিয়ে উঠতেই কক্সবাজারে নতুন করে নির্মাণ করা হচ্ছে আধুনিক মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র। যেখানে এখন চলছে ব্যাপক নির্মাণযজ্ঞ। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ১০টি মাছ ধরার ট্রলার এই ঘাটে মাছ খালাস করতে পারে।
প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে সেই সক্ষমতা বেড়ে দাঁড়াবে ৬০ ট্রলারে। মাছ খালাস থেকে পরিবহনের সময়ও ৪ ঘণ্টা থেকে কমে হবে মাত্র ২ ঘণ্টায়।
প্রকল্পের আওতায় নির্মাণ হচ্ছে ৩ তলা আধুনিক ফিশ ল্যান্ডিং সেন্টার ভবন। থাকবে মাছ হ্যান্ডলিং এলাকা, ট্রাক টার্মিনাল, ব্যবসায়ীদের অফিস, কনফারেন্স রুম, বিশ্রামাগার ও দুর্যোগকালীন মজুত সংরক্ষণ সুবিধা।
প্রকল্পের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপক নাসিউল আলম তৌফিক বাসস’কে বলেন, এটি মূলত একটি আধুনিক মৎস্য অবতরণ ও বাজার কেন্দ্র। এখানে আধুনিক সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হলে এর সুফল মিলবে।
তিনি আরও জানান, বর্তমানে প্রকল্পের ভবন নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। এছাড়া নদীর পাশের অবকাঠামোগত কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এখন মূল ভবনের বিভিন্ন অংশের নির্মাণ কাজ এগিয়ে চলছে। প্রতিদিন এখানে প্রায় ১শ’ থেকে ১৫০ জন শ্রমিক কাজ করছেন।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর তীরে ইতোমধ্যে নির্মিত হয়েছে টেকসই বাঁধ, স্টিলের ২টি জেটি, ২টি পন্টুন ও ২টি গ্যাংওয়ে। নির্মাণ হচ্ছে মাছ বাজার, নামাজ কক্ষ, পাবলিক টয়লেট, গার্বেজ ডিপো এবং আধুনিক পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা। মাছের গুণগত মান ঠিক রাখতে সরবরাহ করা হবে আধুনিক মাছ হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম। এরমধ্যে রয়েছে মাছ ধোয়ার বেসিন, কুলার বক্স, মাছের কন্টেইনার, বাছাই ট্রে, ওজন মাপার যন্ত্র ও উচ্চচাপ ওয়াশার।
মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ বলছে, এতে শুধু অবতরণ কেন্দ্রের সক্ষমতাই বাড়বে না, কমবে সংগ্রহোত্তর ক্ষতিও। একই সঙ্গে জেলে ও মৎস্য শ্রমিকদের জন্য নিশ্চিত হবে স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ।
কক্সবাজার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক আশীষ কুমার বৈদ্য বাসস’কে বলেন, নতুন আধুনিক মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে ট্রাক পার্কিং, মাছ প্যাকিংয়ের আধুনিক ব্যবস্থা, ক্রাশিং মেশিন, জেলেদের থাকার ব্যবস্থা, বিনোদন ও ক্যান্টিন সুবিধা রাখা হচ্ছে। পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের জন্য অফিস, সাগরে যাওয়া মাছ ধরার নৌযানের প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের দোকানসহ একটি পূর্ণাঙ্গ বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
তিনি আরো বলেন, আগে মাছ বিক্রি না হলে দ্রুত নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকত। তবে এখন এখানে আধুনিক ফ্রিজিং প্ল্যান্ট ও কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণ করা হচ্ছে। ফলে মাছের গুণগত মান ঠিক রেখে দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে এবং ব্যবসায়ীদের লোকসানের ঝুঁকি কমে যাবে। সব মিলিয়ে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে জেলে ও ব্যবসায়ীরা সহজে মাছ খালাস, সংরক্ষণ ও বাজারজাত করতে পারবেন।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ সরকার এবং জাপান ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন এজেন্সি’র মধ্যে এই প্রকল্পের অনুদান চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ২০২৫ সালের ১৭ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করা হয়। ২০২৮ সালের জানুয়ারিতে এই প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, জাইকার অর্থায়নে প্রায় ২৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন এই প্রকল্পকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আধুনিক মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র হিসেবে দেখা হচ্ছে। যা কক্সবাজারের সামুদ্রিক অর্থনীতিতে যোগ করবে নতুন গতি।
যা বললেন মৎস্য ব্যবসায়ীরা:
ট্রলার মালিক শামসুল আলম বাসস’কে বলেন, আগে মাছ দীর্ঘসময় রোদে রাখতে হতো। এতে মাছের গুণগত মান নষ্ট হয়ে যেত এবং ব্যবসায়ীদের ক্ষতির মুখে পড়তে হতো। এছাড়া আগের পন্টুন ও অবকাঠামো ছিল ছোট ও ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে ট্রলার থেকে মাছ খালাস করাও ছিল বেশ কষ্টসাধ্য। এখন নতুন করে বড় ও আধুনিক পন্টুন নির্মাণ করা হচ্ছে। এর ফলে মাছ আরও নিরাপদ ও তাজা রাখা সম্ভব হবে এবং নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও কমে যাবে।
কক্সবাজার ফিশিং বোট মালিক সমিতির সভাপতি দেলোয়ার হোসেন বলেন, কক্সবাজার শহরে আগে পর্যাপ্ত জেটি না থাকায় বড় ট্রলার সরাসরি ভিড়তে পারত না। ফলে ছোট ছোট নৌকায় করে ট্রলার থেকে মাছ খালাস করে তীরে আনতে হতো। অনেক সময় অতিরিক্ত মাছ বহনের কারণে ছোট নৌকা দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। এতে ব্যবসায়ীদেরও ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে। যেখানে মাছ খালাস করা হতো সেই স্থানও ছিল অপরিষ্কার ও অগোছালো। পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় অনেক সময় ঠিকভাবে মাছ ল্যান্ডিং করা সম্ভব হতো না।
নতুন মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ও দু’টি আধুনিক জেটির নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হলে ক্ষুদ্র থেকে বড়, সব ধরনের ব্যবসায়ী ও শ্রমিক উপকৃত হবেন। এতে মাছ খালাস, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ অনেক সহজ ও নিরাপদ হবে।