জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে ড. খলিলুর রহমানের দায়িত্ব গ্রহণ বাংলাদেশের কূটনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২ জুনের নির্বাচনে তিনি ৯৯ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন এবং ৮ সেপ্টেম্বর থেকে ৮১তম অধিবেশনের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্যের এই সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব এক বছরের জন্য পালন করবেন তিনি।
ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় খলিলুর রহমানের এই গুরুত্বপূর্ণ পদ বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। কারণ, বর্তমান বিশ্বে বহুপাক্ষিক ব্যবস্থা নানা চাপের মুখে। যুদ্ধ ও সংঘাত, পরাশক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা, জলবায়ু সংকট, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থার সংকট—সব মিলিয়ে জাতিসংঘের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা চলছে। এমন একটি সময়ে সাধারণ পরিষদের নেতৃত্বে একজন বাংলাদেশির থাকা দেশের কূটনৈতিক দৃশ্যমানতা বাড়ানোর বড় সুযোগ তৈরি করেছে। জাতিসংঘ নিজেও ৮১তম অধিবেশনের মূল ভাবনা নির্ধারণ করেছে—‘আস্থা পুনর্গঠন ও রূপান্তর ব্যবস্থাপনা’।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পদকে শুধু প্রতীকী মর্যাদা হিসেবে দেখলে এর গুরুত্ব কমিয়ে দেখা হবে। সাধারণ পরিষদের সভাপতি সরাসরি কোনো দেশের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করেন না, কিন্তু আলোচনার অগ্রাধিকার নির্ধারণ, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমঝোতা তৈরি এবং বৈশ্বিক ইস্যুতে রাজনৈতিক ঐকমত্য গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। বিশেষ করে যখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মতপার্থক্য বাড়ছে, তখন নিরপেক্ষভাবে বিভিন্ন পক্ষকে আলোচনার টেবিলে রাখা একজন সভাপতির বড় চ্যালেঞ্জ।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাংলাদেশের স্বার্থকে বৈশ্বিক আলোচনার সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করার সুযোগ। উন্নয়ন অর্থায়ন, জলবায়ু পরিবর্তন, শান্তিরক্ষা, অভিবাসন, মানবিক সংকট এবং প্রযুক্তির সুশাসনের মতো ইস্যুতে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা রয়েছে। খলিলুর রহমান তাঁর ঘোষিত অগ্রাধিকারের মধ্যে শান্তি ও নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু, মানবাধিকার, নতুন প্রযুক্তির শাসন এবং জাতিসংঘ সংস্কারের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের আরেকটি পর্যবেক্ষণ হলো, এই দায়িত্ব বাংলাদেশের জন্য যেমন সুযোগ, তেমনি এটি একটি কূটনৈতিক পরীক্ষাও। সভাপতির দায়িত্বে ব্যক্তিগত বা জাতীয় অবস্থানের চেয়ে সব সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি নিজেও নির্বাচনের পর সব সদস্য রাষ্ট্রকে সম্পৃক্ত করার এবং মতপার্থক্য উপেক্ষা না করে অভিন্ন জায়গা খোঁজার কথা বলেছেন।
সব মিলিয়ে, খলিলুর রহমানের এই দায়িত্বকে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে দেখা যায়। এখন মূল প্রশ্ন হলো—এই মর্যাদাকে বাংলাদেশ কতটা কৌশলগত কূটনৈতিক সুযোগে পরিণত করতে পারে। সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে এটি শুধু একজন ব্যক্তির অর্জন নয়, বরং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থান আরও দৃঢ় করার একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে উঠতে পারে।