বাংলাদেশ আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যা আগামী এক প্রজন্মের জন্য দেশের কৌশলগত গতিপথ নির্ধারণ করবে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটে। এই রাজনৈতিক পরিবর্তন যেমন নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে, তেমনি একগুচ্ছ জটিল নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জও সৃষ্টি করেছে, যা নতুন প্রশাসনকে একই সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। এই চ্যালেঞ্জগুলোর সবচেয়ে ঘনীভূত, ঐতিহাসিকভাবে জটিল এবং জাতীয় স্থিতিশীলতার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চল।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন বিএনপি সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের সময় বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিবেশ ছিল এক ধরনের নিয়ন্ত্রিত ভঙ্গুরতার মধ্যে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের শুরুর নির্বাচন পর্যন্ত দেশ পরিচালনা করে তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলায় সফল হলেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার অসম্পূর্ণ রেখে যায়। ১৫ বছরের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে গড়ে ওঠা আওয়ামী লীগের নেটওয়ার্কগুলো, যা বেসামরিক প্রশাসন, গোয়েন্দা সংস্থা, বিচার বিভাগ এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে গভীরভাবে প্রোথিত ছিল—সম্পূর্ণরূপে ভেঙে ফেলা হয়নি। কিছু সময়ের জন্য তারা নীরব ছিল, কিন্তু পরবর্তী সময়ে পুনর্গঠনের লক্ষণ দৃশ্যমান হতে শুরু করে। গোপালগঞ্জ, চট্টগ্রামের জঙ্গল সেলিমপুর, বিভিন্ন গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সংগঠিত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে পূর্ববর্তী কর্তৃত্ববাদী কাঠামোর পুনরুত্থানের চেষ্টা লক্ষ করা যায়।
গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও দীর্ঘদিনের রাজনীতিকরণের ফলে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অতীতের আনুগত্য ও প্রভাবের কারণে তারা নতুন সরকারের নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষায় কখনো অকার্যকর, কখনোবা প্রতিবন্ধক হয়ে উঠতে পারে। বেসামরিক-সামরিক সম্পর্ক আপাতদৃষ্টিতে স্থিতিশীল থাকলেও বেসামরিক কর্তৃত্ব সুসংহত করার সময় তা সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করতে হবে। বাহ্যিক পরিবেশও পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। ভারত তার নিকটতম আঞ্চলিক অংশীদারকে হারানোর পর বাংলাদেশ-নীতিকে পুনর্গঠন করছে; মিয়ানমারের চলমান অস্থিরতা সীমান্তে শরণার্থী প্রবাহ ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর হুমকি সৃষ্টি করছে; আর ২০২৬ সালের যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের ফলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সংকট দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলকে কেবল একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমস্যা হিসেবে নয়, বরং একটি কৌশলগত কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখতে হবে, যার অস্থিতিশীলতা দেশের সীমানার বাইরেও প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় এক-দশমাংশ জুড়ে বিস্তৃত এই অঞ্চল ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্ত ভাগ করে নিয়েছে, যা এটিকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম ভূরাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল এলাকায় পরিণত করেছে। এখানে বসবাসকারী প্রায় ১৮ লাখ মানুষের মধ্যে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রোসহ ১৩টি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী রয়েছে, যাদের স্বতন্ত্র পরিচয়, ভূমির সঙ্গে সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান।
১৯৯৭ সালের পার্বত্য শান্তিচুক্তি, যা শান্তিবাহিনী ও সরকারের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছিল, দুই দশকের সশস্ত্র সংঘাতের অবসান ঘটায়। কিন্তু চুক্তিটি শান্তির একটি কাঠামো তৈরি করলেও প্রকৃত শান্তি নিশ্চিত করতে পারেনি। ২৫ বছরেরও বেশি সময় পরও এর বহু গুরুত্বপূর্ণ ধারা বাস্তবায়িত হয়নি। ভূমি কমিশন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, পরস্পরবিরোধী আইন এবং বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর প্রতিরোধের কারণে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারেনি। প্রত্যাহারের কথা থাকলেও অনেক অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প এখনো বহাল রয়েছে। পার্বত্য জেলা পরিষদগুলো পর্যাপ্ত ক্ষমতা ও সম্পদের অভাবে কার্যকর স্থানীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। সংঘাতের সময় বাস্তুচ্যুত বহু পাহাড়ি পরিবারও এখনো তাদের পূর্বপুরুষের ভূমিতে পুনর্বাসিত হয়নি। এসব অসম্পূর্ণতার ফলে দীর্ঘমেয়াদি অসন্তোষের একটি কাঠামো তৈরি হয়েছে, যা সময়ে সময়ে সহিংসতার মাধ্যমে প্রকাশ পায়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে। কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) মিয়ানমার সীমান্তে তাদের কার্যক্রম বৃদ্ধি করেছে। মিয়ানমারের চিন রাজ্যে চলমান গৃহযুদ্ধ এবং ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির কারণে সীমান্তের দুপাশের জাতিগত যোগাযোগ নতুন মাত্রা পেয়েছে। এর ফলে পার্বত্য অঞ্চলের নিরাপত্তা এখন আর শুধু অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়; এটি আঞ্চলিক মাত্রা অর্জন করেছে। অভ্যন্তরীণভাবে জেএসএস এবং ইউপিডিএফের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিভক্তি এখনো অব্যাহত রয়েছে। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সশস্ত্র পরিবেশ রাজনৈতিক সংলাপ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনাকে আরো জটিল করে তুলেছে। পাশাপাশি মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত অপরাধী চক্রগুলো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে অর্থায়ন করছে এবং প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা কাঠামোকে দুর্বল করে তুলছে।
আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, নিরাপত্তা অভিযান প্রয়োজনীয়, কিন্তু তা কখনো রাজনৈতিক সমাধানের বিকল্প হতে পারে না। সামরিক শক্তি রাজনৈতিক সমাধানের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু নিজে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। ভূমি প্রশ্নটি এই অঞ্চলের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন। ভূমি সমস্যার একটি ন্যায্য, বাস্তবসম্মত ও গ্রহণযোগ্য সমাধান ছাড়া সুশাসন, উন্নয়ন বা পুনর্মিলন সম্ভব নয়। এছাড়া পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে একটি একক সত্তা হিসেবে দেখা ভুল হবে। তাদের মধ্যে ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও রাজনৈতিক বাস্তবতার উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। ফলে পার্বত্য অঞ্চলে প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা দায়িত্ব পালনের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ, স্থানীয় বাস্তবতার গভীর উপলব্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। উন্নয়নকে কখনো শান্তির পুরস্কার হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং উন্নয়নই শান্তিকে টেকসই করার অন্যতম প্রধান উপায়। অধিকাংশ পাহাড়ি মানুষ শান্তি, মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সুযোগ চায়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো তাদের সশস্ত্র গোষ্ঠী ও অপরাধী নেটওয়ার্কের প্রভাব থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা।
চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য তিনটি লক্ষ্য একযোগে অর্জন করতে হবে—জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা, কার্যকর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন বাস্তবায়ন করা। এই তিনটি স্তম্ভের যেকোনো একটিকে অবহেলা করলে পুরো কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়বে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলে স্থায়ী ও সম্মানজনক শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। পাহাড়ি জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের অখণ্ডতা ভাঙতে চায় না; তারা চায় তাদের পূর্বপুরুষের ভূমিতে নিরাপদে বসবাস করতে, মর্যাদার সঙ্গে নিজেদের বিষয় পরিচালনা করতে এবং বাংলাদেশের অগ্রগতির সমান অংশীদার হতে। একটি আত্মবিশ্বাসী ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য এগুলো কোনো হুমকি নয়; বরং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ন্যূনতম শর্ত।
নতুন সরকারের সামনে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে—এমন একটি সুযোগ যা খুব কমই কোনো রাষ্ট্রের ইতিহাসে আসে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, পারস্পরিক অবিশ্বাস, অসম্পূর্ণ শান্তি প্রক্রিয়া এবং নিরাপত্তানির্ভর ব্যবস্থাপনার ফলে চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চল বহু দশক ধরে বাংলাদেশের অন্যতম জটিল ও স্পর্শকাতর ইস্যু হিসেবে রয়ে গেছে। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে রাষ্ট্র নতুনভাবে আস্থা পুনর্গঠন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং টেকসই শান্তির ভিত্তি গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে পারে। তবে এই সুযোগের সদ্ব্যবহার স্বয়ংক্রিয়ভাবে হবে না। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা। শুধু বক্তব্য বা প্রতিশ্রুতি নয়, বরং বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমেই জনগণ সরকারের আন্তরিকতা যাচাই করবে। ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি, শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন, স্থানীয় জনগণের আস্থা অর্জন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং উন্নয়নের সুফল সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ ও অবিশ্বাস আরো গভীর হতে পারে।
একই সঙ্গে সরকারকে উপলব্ধি করতে হবে, পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। শুধু নিরাপত্তা অভিযান বা প্রশাসনিক পদক্ষেপের মাধ্যমে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের শক্তি যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন ন্যায়বিচার, সংলাপ এবং অংশগ্রহণমূলক উন্নয়ন। পাহাড়ি জনগোষ্ঠী এবং বাঙালি অধিবাসীদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও সহাবস্থানের পরিবেশ সৃষ্টি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান আঞ্চলিক বাস্তবতাও এই প্রশ্নকে আরো গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। মিয়ানমারের অস্থিতিশীলতা, সীমান্তবর্তী সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান এবং বহিরাগত স্বার্থের সম্ভাব্য প্রভাব পার্বত্য অঞ্চলকে একটি বৃহত্তর কৌশলগত প্রেক্ষাপটে নিয়ে এসেছে। ফলে এখানে শান্তি প্রতিষ্ঠা কেবল একটি আঞ্চলিক উন্নয়ন কর্মসূচি নয়; এটি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা, সীমান্ত স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
নতুন প্রশাসন যদি সাহসী, ভারসাম্যপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি গ্রহণ করতে পারে, তাহলে চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চল সংঘাত ও অবিশ্বাসের প্রতীক থেকে শান্তি, সম্প্রীতি এবং উন্নয়নের একটি সফল মডেলে পরিণত হতে পারে। এটি শুধু পার্বত্য অঞ্চলের জনগণের জন্য নয়, বরং সমগ্র বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক অর্জন হবে। অন্যদিকে যদি রাজনৈতিক বিভাজন, স্বল্পমেয়াদি চিন্তা, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং অনির্ধারিত সমস্যাগুলোকে আগের মতোই অবহেলা করা হয়, তাহলে বিদ্যমান সংকট আরো জটিল হয়ে উঠতে পারে এবং ভবিষ্যতে নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে।
লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক, গবেষক ও লেখক