প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি পার্বত্য চট্টগ্রাম আজ আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর লাগামহীন দৌরাত্ম্যে অশান্ত হয়ে উঠেছে। স্বাধীনতার পাঁচ দশক পার হলেও এখানকার সাধারণ মানুষ শান্তির বদলে প্রতিনিয়ত বারুদের গন্ধে দিন কাটাচ্ছেন। অবৈধ অস্ত্রের মহড়া, আধিপত্য বিস্তারের রক্তক্ষয়ী সংঘাত এবং পাহাড়ি-বাঙালিদের জিম্মি করার অপকৌশল পাহাড়ের রূপবৈচিত্র্যকে ঢেকে দিয়েছে।
পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় রাষ্ট্র বারবার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। তবে সন্ত্রাসী দলগুলোর অনড় অবস্থান ও সমান্তরাল শাসন কায়েমের কারণে স্থায়ী শান্তি অর্জিত হয়নি। স্বাধীন দেশের সার্বভৌম ভূখণ্ডে এমন সশস্ত্র নৈরাজ্য আর কতকাল চলবে, তা নিয়ে এখন পুরো জাতি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।
সম্প্রতি খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার পানছড়িতে ঘটে যাওয়া এক রক্তক্ষয়ী ঘটনা পাহাড়ে আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলোর উগ্রতা ও আধিপত্য বিস্তারের চিত্রকে নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে। খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার চেঙ্গি ইউনিয়নের তারাবন এলাকায় গত ৫ সেপ্টেম্বর- ২০২৬ তারিখে পাহাড়ি দুটি প্রধান আঞ্চলিক দল, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস-মূল) এবং ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ-মূল) এর মধ্যে এক ভয়াবহ সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। সকালের দিকে জেএসএস ক্যাডারদের মহড়া ও ফাঁকা গুলির পর বিকেলে তা রূপ নেয় মুখোমুখি এক রক্তক্ষয়ী গোলাগুলিতে। বিবর্ণ চাকমার নেতৃত্বাধীন ২৫-৩০ জনের জেএসএস দল এবং সুমেন চাকমার পরিচালনায় ৩৫-৪০ জনের সুসজ্জিত ইউপিডিএফ বাহিনীর মধ্যে একটানা আড়াই ঘণ্টাব্যাপী আক্ষরিক অর্থেই যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়। এই দুই পক্ষের মধ্যকার প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ রাউন্ড অনবরত গুলিবিনিময়ের ফলে পুরো তারাবন ও জগা পাড়া এলাকা মুহূর্তে এক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। কোনো প্রাণহানি নিশ্চিত না হলেও অনবরত বিকট গুলির শব্দে অবরুদ্ধ সাধারণ মানুষের মনে এক বিভীষিকাময় ভীতি তৈরি হয়েছিল।
পানছড়ির উত্তাপ প্রশমিত হতে না হতেই ৬ সেপ্টেম্বর- ২০২৬ তারিখে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটির সর্বাপেক্ষা আকর্ষণীয় পর্যটন উপত্যকা সাজেকে ইউপিডিএফ (প্রসীত) ও জেএসএস (সন্তু) গ্রুপের সশস্ত্র ক্যাডারদের বিপজ্জনক মহড়া ও মুখোমুখি অবস্থান পাহাড়ের পরিস্থিতিকে আরও থমথমে করে তোলে। দেশের শীর্ষতম পর্যটন কেন্দ্র সাজেক উপত্যকার নোয়াপাড়া, ৮নং পাড়া, কিচিংপাড়া ও ব্রীজপাড়ার মতো স্পর্শকাতর ও ঘনবসতিপূর্ণ স্থানগুলোতে ইউপিডিএফের প্রায় নব্বইজন এবং জেএসএস গ্রুপের সত্তর-আশিজন ক্যাডার ভারি অস্ত্রশস্ত্রসহ কৌশলগত অবস্থান নেয়। ইউপিডিএফের পক্ষে সুমন চাকমা, কহেন চাকমা ও পরান্টু চাকমা এবং জেএসএসের পক্ষে বিক্রম চাকমা ও মুচং চাকমার মতো শীর্ষ সশস্ত্র কমান্ডারের সরাসরি নেতৃত্বে শতাধিক ক্যাডারের এমন মহড়া যে কোনো মুহূর্তে এক ভয়াবহ রক্তগঙ্গা বইয়ে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছিল। একদিকে সাধারণ স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে জীবনভীতিতে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন, অন্যদিকে সাজেকে বেড়াতে আসা অগণিত পর্যটকদের নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল। মূলত পাহাড়ে পর্যটন শিল্পকে ধ্বংস করা এবং সাধারণ মানুষকে চাপে রাখার কৌশল হিসেবেই সাজেকের মতো জায়গায় সশস্ত্র ক্যাডাররা এই অবস্থান নিয়েছিল।
পাহাড়জুড়ে কায়েম করা এই নৈরাজ্যের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ দেখা গেছে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গায় সুপরিচিত পর্যটন এলাকা রিসাং ঝরনা সংলগ্ন অঞ্চলে ইউপিডিএফ (প্রসীত) বাহিনীর অতর্কিত গুলিবর্ষণে। গভীর রাতে নিরবতা ভঙ্গ করে সেনাবাহিনীর মাটিরাঙ্গা জোনের অন্তর্ভুক্ত সাপমারা আর্মি ক্যাম্পের কয়েক কিলোমিটার উত্তরে এই সশস্ত্র দলটি প্রথম দফায় ১০-১২ রাউন্ড এবং পরবর্তী দফায় গভীর রাত ১২টা থেকে ৩টার মধ্যে আরও প্রায় ৩০ রাউন্ড ফাঁকা গুলি বর্ষণ করে গা ঢাকা দেয়। সর্বমোট ৪০-৪২ রাউন্ড ভারী অস্ত্রের গুলি চালিয়ে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন এবং পর্যটন খাতে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়াই ছিল এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর মূল উদ্দেশ্য। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি রিসাং ঝরনার মতো জায়গায় ঘুরতে আসা পর্যটকদের মনে এই জাতীয় রাতের আঁধারে গুলিবর্ষণ গভীর আতঙ্কের জন্ম দেয়। শান্ত জনপদ মাটিরাঙ্গায় এমন প্রকাশ্য অস্ত্রের ঝংকার প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের জীবন বা এলাকার অর্থনৈতিক অগ্রগতির তোয়াক্কা না করে এই সশস্ত্র দলগুলো কেবল নিজেদের কায়েমি স্বার্থ হাসিল এবং সাধারণ মানুষকে সার্বক্ষণিক ভয়ের সংস্কৃতির মধ্যে বন্দি করে রাখতে চায়।
সাম্প্রতিক পার্বত্য চট্টগ্রামের এই তিনটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা কোনো আকস্মিক অগ্নিকাণ্ড নয়, বরং এটি তাদের দীর্ঘদিনের সুপরিকল্পিত আধিপত্য বিস্তারের ছকেরই অংশ। জেএসএস-মূল, ইউপিডিএফ-মূল, ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিক, জেএসএস-সংস্কার সহ বিভিন্ন উপশাখায় বিভক্ত এই সংগঠনগুলো মুখে তাঁদের জুম্ম জনগণের অধিকার আদায়ের কথা বললেও বাস্তবে তারা সন্ত্রাসী কার্যক্রমেই লিপ্ত। নিজেদের নির্দিষ্ট ভৌগোলিক প্রভাববলয় বা ‘টার্ফ’ ধরে রাখা এবং চাঁদাবাজির রুট সচল রাখার জন্য তারা একে অপরের বিরুদ্ধে চরম শত্রুতায় লিপ্ত হয়। গোষ্ঠীগত এই দ্বন্দ্বের বলি হতে হয় নিরীহ পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীকে, যাদের দৈনন্দিন কাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষি কাজ হুমকির মুখে পড়ে। নিজেদের মধ্যে অঞ্চল ভাগাভাগি এবং আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে পুরো পাহাড়ের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ভেস্তে যাচ্ছে। তথাকথিত অধিকার আদায়ের নামে নিজেদের জাতির মানুষের বুক খালি করা এবং সার্বিক জনজীবনকে অচল করে দেওয়া ছাড়া এই আঞ্চলিক দলগুলোর আর কোনো জনকল্যাণমুখী ভূমিকা সাধারণ মানুষের চোখে পড়ে না।
পার্বত্য অঞ্চলে সশস্ত্র দলগুলোর টিকে থাকার প্রধান রসদ এবং অর্থায়নের মূল উৎস হলো এক ভয়াবহ চাঁদা আদায় ও তোলাবাজি নেটওয়ার্ক। পাহাড়ের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শুরু করে জেলা শহর পর্যন্ত প্রতিটি বাজার, যানবাহন, জুমচাষ, বাঁশ কাটা, ফল বিক্রি এমনকি সাধারণ চাকরিজীবীদের বেতন থেকেও নিয়মিত জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করা হয়। কোনো সাধারণ নাগরিক বা ব্যবসায়ী যদি এই অবৈধ চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে তার কপালে জোটে অমানুষিক নির্যাতন, অপহরণ কিংবা নির্মম হত্যাকাণ্ড। শুধু চাঁদা আদায়ই নয়, পাহাড়ের গহীন অরণ্যকে ব্যবহার করে অবৈধ অস্ত্রের কারবার, মাদক চোরাচালান এবং সীমান্ত পারের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সাথে গোপন যোগসাজশের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অবৈধ অর্থপ্রবাহ নিশ্চিত করছে এই সংগঠনগুলো। এই বিপুল পরিমাণ অবৈধ কালো টাকা দিয়েই তারা আধুনিক ও ভারী সব অস্ত্রশস্ত্র ক্রয় করছে, যা দিয়ে দিন দিন তারা নিজেদের সামরিক শক্তি বাড়িয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ জানানোর দুঃসাহস দেখাচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষ আজ নিজস্ব ভূখণ্ডে থেকেও এক প্রকার মুক্তিপণ দিয়ে জীবনযাপনের চরম অপমানজনক পরিস্থিতি সহ্য করতে বাধ্য হচ্ছে।
গুম, খুন এবং অপহরণ পার্বত্য চট্টগ্রামে আঞ্চলিক সশস্ত্র দলগুলোর এক প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কোনো ব্যক্তি যদি এই সংগঠনগুলোর মতাদর্শের বাইরে গিয়ে স্বাধীন মতামত প্রকাশ করে কিংবা তাদের চাঁদা দাবির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়, তাকে রাতের আঁধারে তুলে নিয়ে যাওয়া এখন পাহাড়ে নিত্যদিনের ঘটনা। অসংখ্য পাহাড়ি তরুণকে জোরপূর্বক ক্যাডার দলে রিক্রুট করা হচ্ছে এবং তা না মানলে পুরো পরিবারকে ভিটেমাটি ছাড়া করার হুমকি দেওয়া হয়। মানবাধিকারের বুলি ছড়ানো দেশি-বিদেশি বিভিন্ন এনজিও সংস্থা পাহাড়ে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বা সেনাবাহিনীর উপস্থিতি নিয়ে সোচ্চার হলেও, আঞ্চলিক সন্ত্রাসী দলগুলোর হাতে অগণিত নিরীহ মানুষের এই নির্মম গুম ও খুনের ঘটনায় অদ্ভুত নীরবতা পালন করে। এই সন্ত্রাসী দলগুলো সাধারণ পাহাড়িদের ভয় দেখিয়ে এমন এক স্তব্ধতার সংস্কৃতি তৈরি করেছে, যেখানে প্রতিবাদের কোনো ভাষা অবশিষ্ট থাকে না। স্বজনহারা পরিবারগুলোর আর্তনাদ পাহাড়ের উপত্যকাগুলোতে প্রতিধ্বনি হলেও সন্ত্রাসী ক্যাডারদের রক্তচক্ষু ও প্রতিশোধের ভয়ে কেউ পুলিশ বা আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার সাহস পর্যন্ত পায় না।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পার্বত্য অঞ্চলের রয়েছে বিপুল সম্ভাবনাময় ভূমিকা, বিশেষ করে পর্যটন এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহারে। কিন্তু সাজেক, রিসাং ঝরনা, পানছড়ি বা বান্দরবানের মতো আকর্ষণীয় এলাকাগুলোতে প্রতিনিয়ত সশস্ত্র সংঘাত ও গোলাগুলির খবর ছড়িয়ে পড়ায় পর্যটন খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দেশি-বিদেশি পর্যটকরা যখন পাহাড়ে নিজেদের জীবন ও নিরাপত্তার হুমকি অনুভব করেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই তারা এসব স্থান ভ্রমণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। ফলে পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য, হোটেল-রিসোর্ট শিল্প এবং স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের রুটি-রুজির ওপর নেমে আসে চরম বিপর্যয়। শুধু পর্যটনই নয়, এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে পাহাড়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, যেমন, রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ এবং বিদ্যুৎ সংযোগ সম্প্রসারণের কাজ বারবার থমকে যায়। ঠিকাদারদের কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি এবং চাঁদা না দিলে নির্মাণকাজে নিয়োজিত কর্মীদের অপহরণ বা হত্যা করার মাধ্যমে পুরো অঞ্চলের উন্নয়ন থমকে দেওয়ার অপচেষ্টা করে চলেছে এই গোষ্ঠীগুলো। ফলে পার্বত্য অঞ্চলকে মূল অর্থনীতির ধারার সাথে যুক্ত করা চরম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।
স্বাধীন বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক ও কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম। সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ কোনো অবস্থাতেই নিজের ভূখণ্ডের একটি নির্দিষ্ট অংশে সমান্তরাল সশস্ত্র শাসন বা সন্ত্রাসী ক্যাডারদের রাজত্ব মেনে নিতে পারে না। পাহাড়ের অখণ্ডতা রক্ষা, সাধারণ জনগণের মৌলিক মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং দেশের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখার স্বার্থে এখনই এই আঞ্চলিক দলগুলোর বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ও সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা অতীব জরুরি হয়ে পড়েছে। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তির শর্তাবলি যারা বছরের পর বছর ধরে লঙ্ঘন করে আসছে এবং অবৈধ অস্ত্র সমর্পণ না করে উল্টো তা দিয়ে রাষ্ট্রকে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সময় এসেছে। পাহাড়ে আস্তানা গড়া প্রতিটি অবৈধ অস্ত্রের জোগানদাতা ও ক্যাডারদের চিরুনি অভিযানের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনতে হবে। সার্বভৌম রাষ্ট্রে কোনো বিশেষ অঞ্চলকে অপরাধীদের নিরাপদ অভয়ারণ্যে পরিণত হতে দেওয়া যায় না, এবং এ বিষয়ে কোনো প্রকার শিথিলতা বা আপসকামিতা মেনে নেওয়ার সুযোগ নেই।