সময় ও প্রজন্ম বদলালেও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং গণতন্ত্রের প্রশ্নে বিএনপি কখনো আপস করেনি বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন।
ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার আপসহীন সংগ্রাম এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আধুনিক রাষ্ট্রদর্শন ধারণ করে মেধাভিত্তিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হবে। ছাত্রদলের মতো দেশপ্রেমিক ছাত্রসংগঠন পাশে থাকলে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা কোনো অপশক্তি রুখতে পারবে না।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ‘জিয়া স্মৃতি বইমেলা ২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন মাহ্দী আমিন। বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে জিয়া স্মৃতি পাঠাগার ও জাতীয়তাবাদী প্রকাশনা সংস্থা এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
মাহ্দী আমিন বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিএনপিই একমাত্র দল, যা দেশের প্রতিটি জাতীয় সংকটে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। যতবার দেশে গণতন্ত্র বিপন্ন হয়েছে, ততবার বিএনপি তা পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছে।
তিনি বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাকশাল-পরবর্তী সময়ে দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছিলেন। খালেদা জিয়া স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়ে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করেন। দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে আবারও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ সুসংহত হচ্ছে।
বাকস্বাধীনতা ও রাষ্ট্র সংস্কারে বিএনপির ভূমিকার কথা তুলে ধরে মাহ্দী আমিন বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান চারটি রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্রের সীমাবদ্ধতা থেকে গণমাধ্যমকে মুক্ত করে বন্ধ থাকা গণমাধ্যমগুলো উন্মুক্ত করেছিলেন। এর মাধ্যমে দেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরে আসে।
তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার শাসনামলে উন্মুক্ত গণমাধ্যম ও আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সুফল পেতে শুরু করে দেশ। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার এমন পরিবেশ তৈরিতে কাজ করছে, যেখানে মৌলিক অধিকার, আইনের শাসন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত থাকবে।
তবে বাকস্বাধীনতার নামে অপপ্রচারের বিষয়েও সতর্ক করেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। তিনি বলেন, একটি কুচক্রী মহল বাকস্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে অপপ্রচার ও অশালীন ভাষা ব্যবহার করে উসকানি দিচ্ছে। বাকস্বাধীনতার নামে চরম অশালীনতা ও মিথ্যাচার চালানো হলে আইন নিজস্ব গতিতে কঠোর ব্যবস্থা নেবে।
বিএনপির পররাষ্ট্রনীতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে নতজানু পররাষ্ট্রনীতির বৃত্ত ভেঙে স্বাধীন ও সার্বভৌম অবস্থান বজায় রাখে। শহীদ জিয়া ও খালেদা জিয়া সার্ক প্রতিষ্ঠা এবং ওআইসিতে বলিষ্ঠ নেতৃত্বের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের মর্যাদা বাড়িয়েছেন।
মাহ্দী আমিনের মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সেই আত্মমর্যাদাশীল পররাষ্ট্রনীতির ধারা আবারও ফিরে এসেছে। মালয়েশিয়া ও চীনের মতো পরাশক্তিগুলোতে তাঁর বীরোচিত সংবর্ধনা এর প্রমাণ।
রাষ্ট্র সংস্কারের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে আধুনিক সংস্কারের মূল রূপকার বিএনপি। শহীদ জিয়ার ১৯ দফা, খালেদা জিয়ার ‘ভিশন ২০৩০’ এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২৭ ও ৩১ দফার আলোকে সমৃদ্ধ ও স্বাবলম্বী বাংলাদেশের পথরেখা তৈরি হয়েছে।
জিয়াউর রহমানের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে মাহ্দী আমিন বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বিএনপি বাংলাদেশের অস্তিত্ব ও আত্মপরিচয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তিনি বলেন, জিয়াউর রহমান ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ চরম মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। পরে একজন সেক্টর কমান্ডার হিসেবে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।
ঐতিহাসিক সিপাহী-জনতার বিপ্লবের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, সেদিন দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এক হয়ে জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করেছিলেন। এরপর তিনি দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের নিজস্ব পরিচয়ের প্রতিটি পরতে জিয়াউর রহমান ও বিএনপির অবদান রয়েছে।
বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বিএনপি সবচেয়ে বেশি রক্ত ও আত্মত্যাগ করেছে বলেও দাবি করেন মাহ্দী আমিন। তার ভাষ্য, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বিএনপির ৪২০ জনের বেশি নেতা-কর্মী শহীদ হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু ছাত্রদলের ১৪০ জনের বেশি নেতা-কর্মী শহীদ হয়েছেন।
বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ব্যাখ্যা দিয়ে মাহ্দী আমিন বলেন, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, শ্রেণি, মত, পথ ও আদর্শের পার্থক্য ভুলে সবাইকে নিয়ে গণতান্ত্রিক আদর্শে দেশ গড়ে তোলাই বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। এ দর্শনে প্রতিটি মানুষের সমান অধিকার, বাকস্বাধীনতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা থাকবে। রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরের পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনিশ্চয়তার সেই সময়ে দেশে কার্যকর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসন বা সরকার না থাকায় বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা জনগণের সুরক্ষা ও নিরাপত্তার দায়িত্ব নেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরাসরি নির্দেশনায় তাঁরা সারা দেশে এ দায়িত্ব পালন করেন বলে দাবি করেন তিনি। তাদের ভূমিকার কারণেই তখন দেশকে স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হয়েছিল বলে মন্তব্য করেন মাহ্দী আমিন।
সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষের অধিকার সুরক্ষার পাশাপাশি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি বিএনপি শ্রদ্ধাশীল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মাহ্দী আমিন বলেন, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের হাত ধরেই সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ এবং সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থার বিষয়টি যুক্ত হয়। পরে খালেদা জিয়া আলেম-ওলামা ও মাশায়েখদের রাষ্ট্র পরিচালনায় সম্মানজনকভাবে সম্পৃক্ত করেন। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ইমাম, মুয়াজ্জিন, খতিবসহ সব ধর্মের ধর্মীয় নেতাদের যথাযথ সম্মান ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে।
দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তৈরি পোশাক খাত ও বিদেশে জনশক্তি রপ্তানি—এই দুটি প্রধান স্তম্ভের মূল রূপকার ছিলেন শহীদ জিয়াউর রহমান। প্রায় পাঁচ দশক ধরে দেশের অর্থনীতি যে ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তার সূচনা তিনি করেছিলেন।
এ ছাড়া খাল খনন, সবুজ বিপ্লব, গ্রাম সরকার গঠন ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের মতো উদ্যোগগুলোও জিয়াউর রহমানের সময় নেওয়া হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন মাহ্দী আমিন। তার মতে, এসব উদ্যোগ এখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে আধুনিক রূপ পেয়েছে। সরকারের ‘কৃষক কার্ড’ ও ‘ফ্যামিলি কার্ড’ও বিএনপির গণমুখী রাজনীতির ধারাবাহিকতা বলে দাবি করেন তিনি।
স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন প্রসঙ্গে মাহ্দী আমিন বলেন, তৃণমূল পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে শহীদ জিয়া উপজেলায় ৩১ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণ শুরু করেছিলেন। পরে খালেদা জিয়া তা ৫০ শয্যায় উন্নীত করেন। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে দেশের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো পর্যায়ক্রমে ১৫১ শয্যার আধুনিক হাসপাতালে রূপান্তরের কাজ শুরু হয়েছে।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আমান উল্লাহ আমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, জিয়া স্মৃতি পাঠাগার কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহমুদা হাবিবা, বিএনপির নির্বাহী কমিটির স্বেচ্ছাসেবক দলের সহসম্পাদক আব্দুল কাদির ভূঁইয়া জুয়েল, ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল এবং জিয়া স্মৃতি পাঠাগার কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. জহির দীপ্তি।