আমরা উন্নয়নের গল্প শুনছি। নতুন সেতু নির্মিত হচ্ছে, শিল্পাঞ্চল বিস্তৃত হচ্ছে, রপ্তানি বাড়ছে, মাথাপিছু আয়ের হিসাব ঊর্ধ্বমুখী। এগুলো নিঃসন্দেহে ইতিবাচক অগ্রগতি। কিন্তু উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ কি শুধু অবকাঠামোর বিস্তার, নাকি মানুষের জীবনের মানোন্নয়নও?
যদি প্রবৃদ্ধির গ্রাফ ওপরে ওঠে, অথচ একজন শ্রমিকের ঘরে স্বস্তি না ফেরে, একজন কৃষক তার ন্যায্য মূল্য না পান, একজন তরুণ কর্মসংস্থানের অভাবে হতাশায় ডুবে থাকে, তাহলে সেই প্রবৃদ্ধির সাফল্য কতটা সার্থক?
আধুনিক অর্থনীতির বেশির ভাগ আলোচনায় মানুষকে দেখা হয় একটি অর্থনৈতিক একক হিসেবে সে উৎপাদন করবে, ভোগ করবে, কর দেবে, বাজারকে সচল রাখবে। কিন্তু ইসলাম মানুষকে তার চেয়েও বড় পরিচয়ে দেখে। সে আল্লাহর বান্দা, পৃথিবীতে তাঁর প্রতিনিধি এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ একটি সত্তা।
তাই ইসলামী অর্থনীতিতে অর্থ কখনোই লক্ষ্য নয়; অর্থ হলো একটি মাধ্যম। লক্ষ্য হলো ন্যায়, ভারসাম্য এবং মানবকল্যাণ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা সেই সম্পদ থেকে ব্যয় করো, যার ওপর তিনি তোমাদের প্রতিনিধিত্ব দিয়েছেন।’ (সুরা: হাদিদ, আয়াত: ৭)
‘মুস্তাখলাফিন’ অর্থ প্রতিনিধি। এই একটি শব্দই ইসলামী অর্থনীতির দার্শনিক ভিত্তিকে স্পষ্ট করে দেয়। মানুষ সম্পদের চূড়ান্ত মালিক নয়; সে একজন তত্ত্বাবধায়ক। যে সম্পদ আজ আমার হাতে আছে, তা একদিন অন্যের হাতে যাবে। তাই সম্পদের সঙ্গে দায়িত্বও অবিচ্ছেদ্য।
পশ্চিমা অর্থনৈতিক দর্শনের একটি বড় অংশ ব্যক্তির স্বাধীনতাকে সর্বোচ্চ মূল্য দিয়েছে। সমাজতান্ত্রিক দর্শন রাষ্ট্রকে করেছে অর্থনৈতিক জীবনের প্রধান নিয়ন্ত্রক। ইসলাম এ দুই প্রান্তিক অবস্থানের পরিবর্তে ভারসাম্যের পথ বেছে নিয়েছে।
ব্যক্তি সম্পদের মালিক হতে পারবেন, উদ্যোগ নেবেন, ব্যবসা করবেন, লাভ করবেন্তকিন্তু তাঁর স্বাধীনতা অন্যের অধিকারকে গ্রাস করতে পারবে না। কারণ, সমাজে এমন মানুষও আছেন, যাদের ভাগ আল্লাহ ধনীদের সম্পদের মধ্যেই নির্ধারণ করে দিয়েছেন।
এ কারণেই ইসলামে জাকাত কোনো দয়া নয়; এটি অধিকার। সদকা কেবল উদারতা নয়; এটি সামাজিক সংহতির প্রকাশ। উত্তরাধিকার আইন কেবল পারিবারিক বিধান নয়; এটি সম্পদের কেন্দ্রীভবন প্রতিরোধের একটি অনন্য অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। সুদের নিষেধাজ্ঞাও শুধু আধ্যাত্মিক নির্দেশ নয়; এটি এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ার প্রচষ্টো, যেখানে অর্থ নিজে নিজে অর্থ উত্পাদনের যনে্ত্র পরিণত না হয়ে বাস্তব উৎপাদন ও শ্রমের সঙ্গে যুক্ত থাকে।
ইংরেজ অর্থনীতিবিদ ই. এফ. শুমাখার তাঁর বিখ্যাত Small Is Beautiful গ্রন্থে লিখেছিলেন, Economics without ethics is like a bodz without a soul.
নৈতিকতাহীন অর্থনীতি আত্মাহীন দেহের মতো। কয়েক দশক আগে উচ্চারিত এই কথাটি আজ আরও বেশি সত্য বলে মনে হয়। কারণ আজ প্রযুক্তি অভূতপূর্ব উন্নতি করেছে, কিন্তু বৈষম্যও নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। উৎপাদন বেড়েছে, কিন্তু মানুষের নিরাপত্তাবোধ সব সময় বাড়েনি। বাজার বড় হয়েছে, কিন্তু বিবেক কি সমানতালে বড় হয়েছে?
মুসলিম মনীষী সাইয়্যিদ আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.) সতর্ক করেছিলেন, যখন সম্পদ মানুষের হাতে একটি উপকরণ না হয়ে মানুষের ওপর কর্তৃত্ব করতে শুরু করে, তখন সভ্যতা তার নৈতিক শক্তি হারাতে থাকে। ইতিহাসের বহু উত্থান-পতন এই সত্যের সাক্ষী। রাসুলুল্লাহ (সা.) অর্থনৈতিক জীবনের এই নৈতিক ভিত্তিকেই আরও সুস্পষ্ট করেছেন। তিনি বলেন, ‘সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন নবী, সিদ্দিক ও শহীদদের সঙ্গে থাকবে।’ (তিরমিজি, হাদিস: ১২০৯)
এখানে সফল ব্যবসায়ীর পরিচয় তাঁর সম্পদের পরিমাণ দিয়ে দেওয়া হয়নি; দেওয়া হয়েছে তাঁর চরিত্র দিয়ে। কারণ ইসলামে বাজার শুধু লেনদেনের জায়গা নয়; এটি নৈতিকতারও পরীক্ষাগার। আজ বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মডেল নিয়ে নতুন করে ভাবা হচ্ছে। ঋণনির্ভর উন্নয়ন, অস্বাভাবিক সম্পদ বৈষম্য এবং ভোগবাদী সংস্কৃতি বিশ্বকে এমন এক সন্ধিক্ষণে এনে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে অর্থনীতির সঙ্গে নৈতিকতার মেলবন্ধন অনিবার্য হয়ে উঠেছে।
সম্ভবত এ কারণেই ইসলামী অর্থনীতি আজ শুধু মুসলিম সমাজের আলোচনার বিষয় নয়; এটি একটি বৈশ্বিক বেৌদ্ধিক আলোচনার অংশ হয়ে উঠছে। কারণ এটি এমন একটি অর্থনীতির কথা বলে, যেখানে প্রবৃদ্ধি থাকবে, কিন্তু শোষণ থাকবে না; বাজার থাকবে, কিন্তু বিবেক নির্বাসিত হবে না; সম্পদ সৃষ্টি হবে, কিন্তু সেই সম্পদ সমাজের রক্তপ্রবাহের মতো সর্বত্র সঞ্চালিত হবে। আর তখনই অর্থনীতির সাফল্য।