একবিংশ শতাব্দীতে যে রাষ্ট্রগুলো সংযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করবে, তারাই অর্থনৈতিক ও কৌশলগতভাবে সবচেয়ে বেশি লাভবান হওয়ার সুযোগ পাবে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অধ্যয়নে অবকাঠামোগত সংযোগকে শুধু পরিবহনব্যবস্থার উন্নয়ন হিসেবে নয়, বরং বাজার সম্প্রসারণ, বাণিজ্য ব্যয় হ্রাস, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক মূল্যশৃঙ্খলে (রিজিওনাল ভ্যালু চেইন) অন্তর্ভুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশেষ করে স্থলবেষ্টিত বা তুলনামূলকভাবে দূরবর্তী উৎপাদন ও বাজারকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে সমুদ্রবন্দরকে যুক্ত করতে পারলে একটি করিডোর তার নিজস্ব ভূগোলের সীমাবদ্ধতাকে অর্থনৈতিক সুযোগে রূপান্তর করতে পারে। ফলে আধুনিক বিশ্বে ‘কোথায় একটি দেশ অবস্থিত’ এই প্রশ্নের চেয়ে ‘কোন কোন অঞ্চলের সঙ্গে দেশটি কতটা কার্যকরভাবে সংযুক্ত’ এই প্রশ্নটি ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশের জন্য মিয়ানমার হয়ে চীনের সঙ্গে স্থলপথে সংযোগের প্রশ্নটি এই বৃহত্তর বাস্তবতার অংশ। বিষয়টি কেবল একটি সড়ক বা রেলপথ নির্মাণের প্রশ্ন নয়; বরং এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, আঞ্চলিক বাণিজ্য, শিল্পায়ন, সরবরাহব্যবস্থা এবং ভূ-রাজনৈতিক সম্ভাবনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বিশেষ করে চীনের ইউনান প্রদেশ, মিয়ানমারের মধ্য ও পশ্চিমাঞ্চল এবং বাংলাদেশের চট্টগ্রামকেন্দ্রিক বন্দর ও অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর মধ্যে কার্যকর স্থল ও বহুমাত্রিক সংযোগ গড়ে উঠতে পারলে দক্ষিণ-পশ্চিম চীনকে বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করার একটি নতুন অর্থনৈতিক অক্ষ তৈরি হতে পারে। এর ফলে বাংলাদেশের জন্য শুধু চীনা বাজারে প্রবেশের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে না; বরং বাংলাদেশ নিজেও বৃহত্তর আঞ্চলিক উৎপাদন, বাণিজ্য ও লজিস্টিকস নেটওয়ার্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
তবে এই সম্ভাবনাকে সরল অবকাঠামোগত প্রকল্প হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন করা যাবে না। একটি কার্যকর করিডোর তখনই অর্থনৈতিকভাবে অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তার সঙ্গে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, কাস্টমস, পণ্য পরিবহন, গুদাম ও লজিস্টিকস অবকাঠামো, ডিজিটাল বাণিজ্যব্যবস্থা, বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন এবং আঞ্চলিক বাজারের সমন্বয় ঘটে। অর্থাৎ সড়ক নির্মাণ করিডোরের সূচনা হতে পারে, কিন্তু করিডোর অর্থনীতি গড়ে ওঠে তার চারপাশে উৎপাদন, বাণিজ্য ও সেবার একটি সমন্বিত বাস্তুতন্ত্র (ইকোসিস্টেম) তৈরি হলে। তাই মিয়ানমার হয়ে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের স্থলসংযোগের প্রশ্নটি একই সঙ্গে একটি পরিবহন প্রকল্প, একটি বাণিজ্যিক সম্ভাবনা এবং একটি দীর্ঘমেয়াদি ভূ-অর্থনৈতিক কৌশলের প্রশ্ন। এখানেই নিহিত রয়েছে বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত। সেই সম্ভাবনাকে বাস্তব অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করতে হলে সুযোগের পাশাপাশি ভূ-রাজনৈতিক, অবকাঠামোগত, নিরাপত্তাগত ও প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জগুলোকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।
দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের ইউনান প্রদেশ বহুদিন ধরেই সমুদ্রপথে প্রবেশাধিকারের ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি। চীনের পূর্বাঞ্চলীয় উপকূলীয় অঞ্চলগুলো অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত উন্নত হলেও ইউনান ও আশপাশের অভ্যন্তরীণ প্রদেশগুলো তুলনামূলকভাবে সমুদ্রবন্দর থেকে দূরে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য পরিবহন ও আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে তাদের অনেকাংশেই চীনের পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলীয় বন্দরগুলোর ওপর নির্ভর করতে হয়। এই ভৌগোলিক বাস্তবতা চীনের অভ্যন্তরীণ অঞ্চলের উন্নয়ন, পরিবহন ব্যয় কমানো এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের জন্য বিকল্প সরবরাহপথ তৈরির প্রশ্নকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। বিশেষ করে চীনের পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়নকে পূর্বাঞ্চলীয় উপকূলের তুলনায় অধিক ভারসাম্যপূর্ণ করার যে দীর্ঘমেয়াদি নীতি, তার সঙ্গে দক্ষিণমুখী আঞ্চলিক সংযোগের বিষয়টিও গভীরভাবে সম্পর্কিত। ফলে চীনের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো দক্ষিণমুখী সংযোগের মাধ্যমে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে আরও কার্যকর যোগাযোগ এবং বিদ্যমান বাণিজ্যপথের পাশাপাশি বিকল্প পথ তৈরি করা। এটি শুধু দূরত্ব কমানোর প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে সরবরাহশৃঙ্খলের (সাপ্লাই চেইন) বৈচিত্র্য, জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক বাজারে প্রবেশ এবং পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি। এই লক্ষ্য থেকেই চীন মিয়ানমারের কিয়াউকফিউ বন্দর, তেল ও গ্যাস পাইপলাইন, অর্থনৈতিক করিডোর এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াভিত্তিক বিভিন্ন সংযোগ প্রকল্পে বিনিয়োগ করে আসছে। কিয়াউকফিউ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বঙ্গোপসাগরের উপকূলে অবস্থিত এই বন্দর ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো চীনের ইউনানকে মিয়ানমারের মধ্যাঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করার পাশাপাশি ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দিকে একটি সরাসরি ভূ-অর্থনৈতিক প্রবেশদ্বারের সম্ভাবনা তৈরি করে। একই সঙ্গে মিয়ানমারের মাধ্যমে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে ভারত মহাসাগরীয় বাজার ও পরিবহনব্যবস্থার সংযোগ বৃদ্ধির বৃহত্তর পরিকল্পনার সঙ্গেও এটি যুক্ত।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ একটি স্বাভাবিক সম্ভাব্য অংশীদার। কারণ ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ দক্ষিণ-পশ্চিম চীন, মিয়ানমার, দক্ষিণ এশিয়া এবং বঙ্গোপসাগরের মধ্যবর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগবিন্দু। তবে বাংলাদেশের গুরুত্ব শুধু মানচিত্রে মধ্যবর্তী অবস্থানের কারণে নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চট্টগ্রাম ও অন্যান্য সমুদ্রবন্দর, ক্রমবর্ধমান শিল্পভিত্তি, বৃহৎ ভোক্তা বাজার এবং দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সম্ভাব্য বাণিজ্যিক সংযোগ। ফলে একটি কার্যকর স্থলপথ যদি চীনের ইউনানকে মিয়ানমারের মধ্যাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে, তাহলে এই সংযোগ কেবল দুই দেশের মধ্যে পণ্য পরিবহনের পথ হিসেবে কাজ করবে না; বরং তা বৃহত্তর আঞ্চলিক উৎপাদন ও বাণিজ্য নেটওয়ার্কের অংশ হয়ে উঠতে পারে।
যদি কুনমিং থেকে ম্যান্ডালে, সেখান থেকে মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চল ও রাখাইন হয়ে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চলের সঙ্গে কার্যকর সড়ক ও রেল সংযোগ গড়ে ওঠে, তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি সম্পূর্ণ নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করতে পারে। এমন একটি করিডোর কার্যকর হলে চট্টগ্রামকে শুধু বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানির বন্দর হিসেবে নয়, বরং আঞ্চলিক ট্রানজিট ও লজিস্টিকস কেন্দ্রে (হাব) রূপান্তরের সম্ভাবনা তৈরি হবে। এর মাধ্যমে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পণ্য বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দরের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাতে পারে; একইভাবে বাংলাদেশের শিল্পপণ্য, কৃষিপণ্য ও অন্যান্য রপ্তানি পণ্যও স্থলপথে দ্রুত আঞ্চলিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ পেতে পারে।
এই করিডোর বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণে সহায়তা করতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রধানত ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকাকেন্দ্রিক। এই বাজারগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও অতিরিক্ত বাজারনির্ভরতা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, বাণিজ্যনীতি পরিবর্তন, ভোক্তা চাহিদার ওঠানামা, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন কিংবা ভূ-রাজনৈতিক সংকটের সময় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বাজার বৈচিত্র্যকরণ (মার্কেট ডাইভার্সিফিকেশন) তাই বাংলাদেশের রপ্তানি কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া প্রয়োজন। এশিয়ার অভ্যন্তরীণ বাজার, বিশেষ করে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, মিয়ানমার এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্রুত পরিবর্তনশীল ভোক্তা ও উৎপাদন বাজারের সঙ্গে উন্নত সংযোগ বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি কৃষিপণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, ওষুধ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল পণ্য (যন্ত্রপাতি) এবং ডিজিটাল ও পেশাগত সেবার মতো খাতও এই বাজার সম্প্রসারণের সুবিধা পেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, এই করিডোর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে রাজধানীকেন্দ্রিকতা থেকে বের করে আনতে পারে। বাংলাদেশের উন্নয়ন দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা ও চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। এর ফলে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও অবকাঠামোগত বিনিয়োগের সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত থেকেছে। একটি কার্যকর আঞ্চলিক করিডোর এই ভৌগোলিক কেন্দ্রীভবন কিছুটা পরিবর্তন করার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। যদি আঞ্চলিক করিডোর বাস্তবায়িত হয় এবং এর সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সড়ক, রেল, নৌপথ ও বন্দর অবকাঠামোর কার্যকর সংযোগ তৈরি করা যায়, তাহলে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, বান্দরবান, রাঙামাটি এবং বৃহত্তর পূর্বাঞ্চলীয় অঞ্চল নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। শিল্প, গুদামজাতকরণ, পরিবহন, পর্যটন এবং বিভিন্ন সেবাখাতের বিকাশ স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন প্রাণসঞ্চার করতে পারে। এর ফলে রাজধানী ও কয়েকটি বড় শহরের ওপর কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের চাপ কিছুটা কমার পাশাপাশি আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাসের সুযোগও সৃষ্টি হতে পারে। উন্নয়ন অর্থনীতির ভাষায়, এটি অবকাঠামোকে শুধু প্রবৃদ্ধির উপকরণ হিসেবে নয়, বরং স্থানভিত্তিক অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করবে।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশ একটি ট্রানজিট ও লজিস্টিকস হাব হিসেবে আত্মপ্রকাশের সুযোগ পেতে পারে। বিশ্বের বহু সফল অর্থনীতি প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নয়, বরং তাদের ভৌগোলিক অবস্থানকে দক্ষ অবকাঠামো, বন্দর, বাণিজ্যিক সেবা এবং লজিস্টিকস সক্ষমতার মাধ্যমে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তর করে গড়ে উঠেছে। সিঙ্গাপুর, দুবাই কিংবা নেদারল্যান্ডসের উদাহরণ দেখলে বোঝা যায়, কৌশলগত অবস্থান নিজে কোনো অর্থনৈতিক সম্পদ নয়; সেটিকে সম্পদে পরিণত করতে প্রয়োজন কার্যকর প্রতিষ্ঠান, অবকাঠামো, দক্ষ মানবসম্পদ, বাণিজ্যবান্ধব নীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রযোজ্য। বঙ্গোপসাগরের উপকূল, চট্টগ্রাম ও অন্যান্য বন্দর, অভ্যন্তরীণ নৌপথ এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলের অবস্থানকে যদি সমন্বিত লজিস্টিকস ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তবে বাংলাদেশ শুধু নিজস্ব আমদানি-রপ্তানির গন্তব্য বা উৎস হিসেবে নয়, বরং আঞ্চলিক পণ্য পরিবহন ও বাণিজ্যসেবার একটি কেন্দ্র হিসেবেও ভূমিকা রাখতে পারে। এতে শুধু ট্রানজিট ফি নয়, বন্দরসেবা, গুদামজাতকরণ, কনটেইনার ব্যবস্থাপনা, বিমা, ব্যাংকিং, প্যাকেজিং, মেরামত, পরিবহন ও অন্যান্য সহায়ক সেবার মাধ্যমে বহুগুণ বেশি অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে মিয়ানমার করিডরের প্রকৃত মূল্য শুধু একটি নতুন পথ পাওয়ার মধ্যে নয়; বরং সেই পথকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের নিজস্ব লজিস্টিকস অর্থনীতি কতটা বিকশিত হতে পারে, তার মধ্যেই নিহিত।
এখানে একটি মৌলিক বিষয় স্মরণ রাখা প্রয়োজন করিডোর কোনো লক্ষ্য নয়; এটি হলো একটি মাধ্যম। লক্ষ্য হলো জাতীয় সমৃদ্ধি। কোনো সংযোগ প্রকল্পের মূল্যায়ন তাই শুধু কত কিলোমিটার সড়ক বা রেলপথ নির্মিত হবে, কত পণ্য পরিবাহিত হবে কিংবা কত ট্রানজিট রাজস্ব আসবে এসব সূচকে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। দেখতে হবে, সেই সংযোগ বাংলাদেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, রপ্তানি, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, আঞ্চলিক বাজারে প্রবেশ এবং সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা কতটা বাড়াতে পারছে। একই সঙ্গে এর পরিবেশগত, সামাজিক, নিরাপত্তাগত ও আর্থিক ঝুঁকিও হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে। অর্থাৎ একটি প্রকল্পের সাফল্য নির্ধারিত হবে তার অবকাঠামোগত আকার দিয়ে নয়, বরং জাতীয় উন্নয়নে তার নিট অবদানের মাধ্যমে।
এই কারণেই বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের সামনে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ উপস্থিত হয়েছে। তারা চাইলে দেশের ভৌগোলিক অবস্থানকে কেবল মানচিত্রের একটি বাস্তবতা হিসেবে রেখে দিতে পারেন; আবার চাইলে অবকাঠামো, বাণিজ্য, শিল্প, মানবসম্পদ ও কূটনীতির সমন্বিত ব্যবহারের মাধ্যমে সেটিকে অর্থনৈতিক শক্তি ও কৌশলগত সম্পদে রূপান্তর করতে পারেন। মিয়ানমার হয়ে চীনের সঙ্গে স্থলপথে সংযোগের প্রশ্নটি সেই বৃহত্তর সম্ভাবনারই একটি অংশ। তবে এই সম্ভাবনা বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশের নীতি হওয়া উচিত অতি-আশাবাদী বা অতি-সন্দেহপ্রবণ কোনোটিই নয়; বরং সম্ভাবনা, ব্যয়, ঝুঁকি ও জাতীয় স্বার্থের একটি সুসংহত মূল্যায়নের ভিত্তিতে ধাপে ধাপে এগোনো। মিয়ানমারের পরিস্থিতি অনুকূল হলে যাতে বাংলাদেশ প্রস্তুত থাকে, আবার পরিস্থিতি অনুকূল না হলে যাতে অতিরিক্ত ঝুঁকির মধ্যে না পড়ে এই দ্বৈত প্রস্তুতিই হতে পারে বাস্তববাদী নীতির ভিত্তি। শেষ পর্যন্ত মিয়ানমার করিডোরের প্রকৃত গুরুত্ব এখানেই: এটি শুধু চীনের সঙ্গে একটি সম্ভাব্য নতুন পথ নয়; বরং বাংলাদেশের ভূগোলকে কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনে রূপান্তর করা যায়, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, করিডোরের সম্ভাব্য সুবিধা যেন শুধু ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে পণ্য চলাচলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। অতীতে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে করিডোর প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও সংশ্লিষ্ট দেশগুলো সবসময় সমান অর্থনৈতিক মূল্য অর্জন করতে পারেনি। কারণ করিডোরের সঙ্গে নিজেদের শিল্প, বন্দর, লজিস্টিকস, মানবসম্পদ, প্রযুক্তি ও নীতিগত সক্ষমতাকে যথেষ্ট দ্রুত সংযুক্ত করতে না পারলে একটি দেশ মূলত ট্রানজিট ভূখণ্ডে পরিণত হতে পারে। বাংলাদেশের জন্য তাই প্রয়োজন ‘করিডোর থেকে অর্থনীতি’ এবং ‘অর্থনীতি থেকে মূল্য সংযোজন’ এই দুই ধাপকে একসঙ্গে পরিকল্পনা করা।
বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের সামনে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ উপস্থিত হয়েছে। দেশের ভৌগোলিক অবস্থানকে কেবল মানচিত্রের বাস্তবতা হিসেবে রেখে দেওয়া যায়; আবার অবকাঠামো, বাণিজ্য, শিল্প, মানবসম্পদ, কূটনীতি ও আঞ্চলিক সহযোগিতার সমন্বিত ব্যবহারের মাধ্যমে সেটিকে অর্থনৈতিক শক্তি ও কৌশলগত সম্পদে রূপান্তরও করা যায়। মিয়ানমার হয়ে চীনের সঙ্গে স্থলপথে সংযোগ সেই বৃহত্তর সম্ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে বিবেচনার বিয়য়। তবে এই সম্ভাবনা বাস্তবায়নের পথ সরল নয় এবং এর সময়সীমাও অনিশ্চিত। তাই বাংলাদেশের সবচেয়ে দূরদর্শী পদক্ষেপ হতে পারে সম্ভাব্য সংযোগের জন্য প্রয়োজনীয় অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা তৈরি করা, সম্ভাব্য রুট ও বিকল্প রুট নিয়ে সমীক্ষা চালানো, বন্দর ও লজিস্টিকস সক্ষমতা বাড়ানো, সীমান্ত অবকাঠামো আধুনিক করা এবং একই সঙ্গে মিয়ানমারের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখা।
চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ করিডোর বাংলাদেশের জন্য শুধু চীনের সঙ্গে একটি নতুন স্থলপথের সম্ভাবনা নয়; এটি নিজের ভূগোলকে কীভাবে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা যায়, তার একটি বড় সুযোগ ও পরীক্ষা। বাংলাদেশের সামনে প্রশ্নটি তাই কেবল ‘চীনের সঙ্গে সংযোগ হবে কি না’ এতটুকু নয়; বরং ‘সংযোগ তৈরি হলে বাংলাদেশ তার কতটা মূল্য নিজের অর্থনীতি, শিল্প ও মানুষের উন্নয়নে রূপান্তর করতে পারবে’ সেটিই অধিক গুরুত্বপূর্ণ। যদি জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক বাস্তবতা, নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনাকে সমন্বিত করে এগোনো যায়, তবে বঙ্গোপসাগর থেকে ইউনান পর্যন্ত সম্ভাব্য এই সংযোগ ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন আঞ্চলিক অর্থনৈতিক দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। ভূগোল তখন আর শুধু অবস্থান থাকবে না; সুপরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার মাধ্যমে সেটিই হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি।
লেখক : ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য।