সুদানের বিতর্কিত আবিয়েই অঞ্চলের একটি বাজারে ভয়াবহ ড্রোন হামলায় অন্তত ১৫৩ জন নিহত হয়েছেন। হামলার পর বাজারে ছড়িয়ে পড়া আগুনে পুড়ে গেছে বহু মানুষের মরদেহ। এখনো চলছে উদ্ধারকাজ, ফলে প্রাণহানির সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ঘটনায় ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন প্রায় ৮ হাজার মানুষ।
দক্ষিণ সুদানের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ তথ্য জানিয়েছে।
আবিয়েই অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত তথ্যমন্ত্রী ইয়োহানা আকোল এনগর মঙ্গলবার রয়টার্সকে জানান, সোমবার বাজারে হামলার পর প্রথমে ৭৩ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। পরে এ সংখ্যা বেড়ে ১৫৩ হয়।
তিনি বলেন, ‘আগুন এখনো জ্বলছে। তাই নিহতদের মরদেহ উদ্ধারের কাজও চলছে। পরিস্থিতি ভয়াবহ।’ আগুনে কয়েকজনের মরদেহ পুরোপুরি পুড়ে গেছে বলেও জানান তিনি।
মঙ্গলবার ঘটনাস্থলে ধারণ করা একটি ভিডিও যাচাই করেছে রয়টার্স। এতে পুড়ে যাওয়া ও দুমড়েমুচড়ে যাওয়া যানবাহন এবং ভবনের ধ্বংসাবশেষ দেখা গেছে। বাসিন্দারা ক্ষয়ক্ষতি দেখার সময়ও একটি ভবনে আগুন জ্বলছিল।
হামলার জন্য সুদানের সেনাবাহিনীকে দায়ী করেছেন এনগর। তবে এ দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ দেননি তিনি। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে রয়টার্স সুদানের সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তিনজন কূটনীতিক, একজন ত্রাণকর্মী ও সংঘাতবিষয়ক একজন বিশেষজ্ঞ রয়টার্সকে জানিয়েছেন, হামলায় বাজারের একটি জ্বালানি ডিপোতে আঘাত হানা হয়। তাঁদের ভাষ্য, অতীতে ডিপোটি আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) সেনাদের জ্বালানি সরবরাহের কাজে ব্যবহার করা হতো। এ বিষয়ে আরএসএফের বক্তব্যও তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
গত কয়েক দিনের হামলায় নিহত ২৫০ ছাড়িয়েছে
সুদানের সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী আরএসএফের মধ্যে ২০২৩ সালের এপ্রিলে যুদ্ধ শুরু হয়। তিন বছরের বেশি সময় ধরে চলা এ সংঘাতে দেশটিতে ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। এতে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী ও বিদেশি শক্তিও জড়িয়ে পড়েছে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় ড্রোন হামলা বেড়েছে। স্থানীয় জরুরি সাড়া প্রদানকারী দলের তথ্য অনুযায়ী, রবিবার পশ্চিম কর্দোফান রাজ্যে ড্রোন হামলায় প্রায় ৮৪ জন নিহত ও ৬৫ জন আহত হন। রাজ্যটির বড় অংশ আরএসএফের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
সোমবার সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা খার্তুম বিমানবন্দরেও একাধিক ড্রোন হামলা চালানো হয়। এতে চার শিশু নিহত হয়। এর আগে শুক্রবার আরএসএফের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত নিয়ালা শহরের একটি বাজারে হামলায় ২৩ জন নিহত ও ৪৪ জন আহত হন বলে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকেরা জানিয়েছেন।
এসব হামলায় গত কয়েক দিনে সুদানে নিহতের সংখ্যা ২৫০ ছাড়িয়েছে।
চাদের কর্মকর্তারাও অভিযোগ করেছেন, সুদানের সেনাবাহিনী তাদের ভূখণ্ডে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের মতে, চাদের ভূখণ্ড নিয়মিতভাবে আরএসএফের রসদ সরবরাহের কাজে ব্যবহৃত হয়।
আবিয়েই নিয়ে সুদান-দক্ষিণ সুদান বিরোধ
২০১১ সালে সুদান থেকে স্বাধীনতা লাভ করে দক্ষিণ সুদান। এরপর থেকে তেলসমৃদ্ধ আবিয়েই অঞ্চলের মালিকানা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিরোধ চলছে। অঞ্চলটি যৌথভাবে পরিচালিত হয়। এর সীমান্ত রয়েছে সুদানের কর্দোফান অঞ্চলের সঙ্গে, যা বর্তমানে দেশটির যুদ্ধের অন্যতম প্রধান সংঘাতপূর্ণ এলাকা।
সুদানের সেনাবাহিনী-সমর্থিত সরকারের কর্মকর্তারা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, আবিয়েইয়ের কয়েকটি এলাকায় আরএসএফ সক্রিয় রয়েছে। তবে অঞ্চলটিতে আরএসএফের উপস্থিতির কথা অস্বীকার করেছেন এনগর। এসব দাবির সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স।
জাতিসংঘের অন্তর্বর্তী আবিয়েই নিরাপত্তা বাহিনী (ইউএনআইএসএফএ) গত মে মাসে সতর্ক করে বলেছিল, অঞ্চলটিতে আরএসএফের উপস্থিতির কারণে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। অঞ্চলটির চূড়ান্ত অবস্থান নির্ধারণে দেরি হওয়ায় সাধারণ মানুষ ও জাতিসংঘের কর্মীরা ঝুঁকিতে রয়েছেন বলেও জানায় সংস্থাটি।
জাতিসংঘের মুখপাত্র স্তেফান দুজারিক আবিয়েইসহ বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিক ড্রোন হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। নিউইয়র্কে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, সুদানজুড়ে একের পর এক ড্রোন হামলা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে জাতিসংঘ গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। দীর্ঘদিনের সংঘাতের ক্ষতি সামলাতে হিমশিম খাওয়া মানুষের ওপর এসব হামলা ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে।
আহতদের চিকিৎসা দিচ্ছে এমএসএফ
হামলার পর বাজারে আগুন ছড়িয়ে পড়ায় উদ্ধারকর্মীরা মরদেহ উদ্ধারে সমস্যায় পড়ছেন। দক্ষিণ সুদানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সোমবার গভীর রাতে জানায়, আবিয়েই শহরের উত্তরে একটি বাজারে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। তবে হতাহতের সংখ্যা জানায়নি মন্ত্রণালয়। এ ঘটনায় প্রতিবাদ জানাতে সুদানের রাষ্ট্রদূতকে তলব করা হয়েছে বলেও জানানো হয়।
নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, তিনি পরপর পাঁচটি শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন। এরপরই জ্বালানির বাজারটিতে আগুন ধরে যায়। আহতদের সরিয়ে নেওয়ার সময় তাঁদের পেট ও পায়ে বিস্ফোরণের টুকরার আঘাত দেখতে পান তিনি। একটি জায়গায় আগুনে পুড়ে যাওয়া ২৮টি মরদেহ দেখেছেন বলেও জানান ওই প্রত্যক্ষদর্শী। বাজারে আরএসএফ বা অন্য কোনো বাহিনীর ইউনিফর্ম পরা যোদ্ধা তিনি দেখেননি।
বাজারটিতে চিনি, ময়দা ও বিস্কুটের মতো পণ্য বিক্রি হতো। এসব পণ্য সুদানে পাঠানো হয়।
আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সহায়তা সংস্থা মেদসাঁ সঁ ফ্রন্তিয়ের (এমএসএফ) জানিয়েছে, কাছের আমেথ বেক হাসপাতালে তারা ২০ জনের বেশি আহত ব্যক্তির চিকিৎসা দিচ্ছে। তাঁদের কয়েকজন আগুনে পুড়ে আহত হয়েছেন।
হাসপাতালটিতে এমএসএফের চিকিৎসা কার্যক্রমের ব্যবস্থাপক ক্রিশ্চিয়ান লিন্ডাউয়ার বলেন, আহতদের অস্ত্রোপচার, ক্ষতস্থানে ব্যান্ডেজ করা এবং অন্যান্য জরুরি চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।
সূত্র: রয়টার্স