দেশে ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৬৭ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জনসংখ্যা প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শেষে দেশে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ১ কোটি ৬৮ লাখ। বিপুল এই জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসা, আবাসন ও সামাজিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা এখনো প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
এই বাস্তবতায় আজ দেশে পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব প্রবীণ দিবস’। এবারের প্রতিপাদ্য—‘দীর্ঘায়ুর যুগ : দীর্ঘ জীবনের জন্য ব্যবস্থাগুলোর পুনর্চিন্তা’।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও সামাজিক সুরক্ষার পরিধি বাড়েনি। বয়স্ক ভাতা চালু থাকলেও তা পেতে নানা ধরনের জটিলতা ও ভোগান্তির অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে প্রবীণদের জন্য আলাদা কোনো মন্ত্রণালয় না থাকায় বিভিন্ন সরকারি সেবা পেতে তাদের একাধিক দপ্তরের ওপর নির্ভর করতে হয়।
অপ্রতুল প্রবীণ নিবাস
সরকারি উদ্যোগে প্রবীণদের আবাসনের জন্য দেশের আট বিভাগে ‘শান্তি নিবাস’ নামে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। সমাজসেবা অধিদপ্তর জানিয়েছে, প্রকল্পটি সম্পন্ন হলেও এখনো এর কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি। নতুন করে জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে এবং বিষয়টি সচিব কমিটিতে অনুমোদনের জন্য বিবেচনাধীন।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রতিষ্ঠান অধিশাখা) মোহা. কামরুজ্জামান বলেন, বিদ্যমান জনবল দিয়ে দেশের ৮৫টি সরকারি শিশু পরিবারের প্রতিটিতে ১০ জন করে প্রবীণের আবাসনের ব্যবস্থা করা যায় কি না, তা নিয়ে পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তবে অনেক প্রবীণ সেখানে থাকতে আগ্রহী নন।
তিনি জানান, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক সহায়তায় বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘে ৫০ শয্যার একটি প্রবীণ নিবাস স্থাপন করা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. এ এস এম আতিকুর রহমান বলেন, প্রবীণদের জন্য বিদ্যমান নীতিমালা ও পিতামাতার ভরণপোষণ আইন বাস্তবায়নে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। তার মতে, প্রবীণদের জন্য সর্বজনীন সামাজিক পেনশন চালুর পাশাপাশি প্রবীণ উন্নয়ন ফাউন্ডেশন আইন প্রণয়ন করা দরকার।
তিনি বলেন, প্রবীণদের আর্থিক, মানসিক, সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে একটি সমন্বিত কাঠামোর মাধ্যমে সেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে প্রবীণ নারীরা তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকায় তাঁদের সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
বয়স্ক ভাতাতেও ভোগান্তি
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট অনুযায়ী, বর্তমানে বয়স্ক ব্যক্তিদের মাসে ৭০০ টাকা করে ভাতা দেওয়া হচ্ছে। ৯০ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য এ ভাতার পরিমাণ ১ হাজার টাকা।
সমাজসেবা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, অতীতে অনেক প্রবীণ নিজের পরিবর্তে সন্তান, নাতি-নাতনি বা অন্য স্বজনের মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে ভাতা নিতেন। এতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্বজনদের মাধ্যমে ভাতার অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া যায়। এ সমস্যা কমাতে সরকার ভাতাভোগীর নিজের নামে থাকা মোবাইল নম্বরে অর্থ পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে।
তবে মোবাইল নম্বর পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কারণে কোনো কোনো ভাতাভোগীকে অর্থ পেতে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধেও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সরকারি সহায়তার কথা বলে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের পিন বা গোপন কোড সংগ্রহ করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম বলেন, দেশে প্রবীণ জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ ‘এজিং সোসাইটি’র পর্যায়ে প্রবেশ করবে। ফলে প্রবীণদের কথা বিবেচনায় রেখে বিদ্যমান পরিকল্পনা নতুন করে সাজানো এবং সরকারি-বেসরকারি সেবাগুলোকে আরও প্রবীণবান্ধব করা প্রয়োজন।
বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার ঘাটতি
প্রবীণদের চিকিৎসার বিশেষায়িত শাখা ‘জেরিয়াট্রিক মেডিসিন’। দেশে এ ধরনের চিকিৎসাসেবা এখনো সীমিত। ফলে প্রবীণদের অনেক ক্ষেত্রেই অন্যান্য রোগীর সঙ্গে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে চিকিৎসা নিতে হয়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রবীণদের জন্য বিশেষায়িত সেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা কার্যকর হয়নি। কিছু বেসরকারি ও বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে বিচ্ছিন্নভাবে এ সেবা দেওয়া হচ্ছে।
রাজধানীর বারডেম হাসপাতালে প্রবীণদের জন্য জেরিয়াট্রিক ডে কেয়ার ইউনিট রয়েছে। ইউনিটটির প্রধান ডা. মো. আশরাফ উদ্দিন আহমেদ জানান, শুক্রবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত প্রবীণদের বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। প্রবীণদের দ্রুত চিকিৎসাসেবা দিতে ‘ফল ক্লিনিক’ চালুর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
আলাদা মন্ত্রণালয়ের দাবি
দেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর কল্যাণে আলাদা মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানের মহাসচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ইন্তেজার রহমান।
তিনি বলেন, দেশের বিশাল প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো মন্ত্রণালয় নেই। আলাদা মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা হলে রাজধানীর বাইরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে থাকা অসুস্থ, অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত প্রবীণদের সরকারি সেবার আওতায় আনা সহজ হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধিকে শুধু জনসংখ্যাগত পরিবর্তন হিসেবে দেখলে চলবে না। তাদের স্বাস্থ্য, আর্থিক নিরাপত্তা, আবাসন, সামাজিক মর্যাদা ও মানসিক সুস্থতাকে সমন্বিতভাবে বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। ক্রমবর্ধমান প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য এখনই কার্যকর নীতি ও সেবাব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।