ইসরায়েলকে প্রায় ৬০ হাজার ভারী বোমা দেওয়ার জন্য একটি বড় অস্ত্রচুক্তির প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন প্রায় ২৮০ কোটি ডলারের এই অস্ত্র সরবরাহের অনুমোদন দিয়েছে বলে বিভিন্ন মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
তবে ট্রাম্প প্রশাসন এখনো প্রকাশ্যে এই অস্ত্রচুক্তির বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের নীতি অনুযায়ী, কংগ্রেসে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানোর আগে প্রস্তাবিত অস্ত্র বিক্রির বিষয়ে তারা সাধারণত মন্তব্য করে না।
প্রস্তাবিত চুক্তিতে ২ হাজার পাউন্ড বা প্রায় ৯০৭ কেজি ওজনের ৬০ হাজার বোমা রয়েছে। এর মধ্যে ২০ হাজার এমকে-৮৪, ২০ হাজার বিএলইউ-১১৭ এবং ২০ হাজার আই-২০০০ ধরনের বোমা রয়েছে। সব মিলিয়ে এসব বোমার মোট ওজন প্রায় ৫৪ হাজার ৪০০ টন।
এ ধরনের ২ হাজার পাউন্ডের বোমা সাধারণ বোমার তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী। এগুলোর কয়েকটি বড় ভবন, শক্ত স্থাপনা ও মাটির নিচে থাকা লক্ষ্যবস্তু ধ্বংসের জন্য তৈরি করা হয়েছে।
এমকে-৮৪ মার্ক-৮০ সিরিজের সবচেয়ে বড় প্রচলিত বোমাগুলোর একটি। এটি বড় ভবন ও মাঝারি মাত্রায় শক্ত লক্ষ্যবস্তুতে ব্যাপক বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী এতে গাইডেন্স কিট যুক্ত করে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা বাড়ানো যায়।
বিএলইউ-১১৭ একই ওজনের একটি বোমা, তবে এর বিস্ফোরক উপাদান ও নকশায় পার্থক্য রয়েছে। এটিতেও গাইডেন্স কিট ব্যবহার করা সম্ভব। অন্যদিকে আই-২০০০ মূলত ‘বাংকার বাস্টার’ হিসেবে পরিচিত। এটি মাটি, পাথর বা কংক্রিটের স্তর ভেদ করে পরে বিস্ফোরিত হওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে।
ইসরায়েল কয়েক দশক ধরে ২ হাজার পাউন্ড শ্রেণির বোমা ব্যবহার করে আসছে। ১৯৮১ সালে ইরাকের ওসিরাক পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা এবং ১৯৮২ সালে লেবানন ও সিরিয়ায় ইসরায়েলি অভিযানে এ ধরনের ভারী বোমা ব্যবহারের তথ্য রয়েছে।
গাজা যুদ্ধেও এসব বোমার ব্যবহার নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। ২০২৩ সালের ৩১ অক্টোবর জাবালিয়া শরণার্থীশিবিরে ইসরায়েলি হামলায় ২ হাজার পাউন্ডের বোমা ব্যবহারের কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর ওই হামলা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলে জানিয়েছিল।
আল-জাজিরার একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে গাজায় ব্যবহৃত মার্কিন তৈরি বিভিন্ন ভারী বোমার বিষয়েও আলোচনা করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যের পাশাপাশি বিভিন্ন হামলার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট কোনো অস্ত্রের কারণে প্রতিটি হতাহতের ঘটনা ঘটেছে—এমন সিদ্ধান্ত সব ক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন ২০২৪ সালে ইসরায়েলের জন্য ২ হাজার পাউন্ডের কিছু বোমার চালান সাময়িকভাবে স্থগিত করেছিল। পরে ট্রাম্প প্রশাসন সেই স্থগিতাদেশ তুলে নেয়। এরপর ইসরায়েলের জন্য আরও বড় কয়েকটি অস্ত্র সরবরাহের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
নতুন এই প্রস্তাবিত অস্ত্রচুক্তি এমন সময়ে সামনে এলো, যখন মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের পাশাপাশি ইউক্রেন যুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্র বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করছে। পেন্টাগনের বিভিন্ন প্রতিবেদনে মার্কিন অস্ত্রের মজুতের ওপর চাপ তৈরি হওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে।
ট্রাম্প এর আগে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র অত্যাধুনিক অস্ত্র তৈরি করছে এবং ইসরায়েলকে প্রতিদিন এসব অস্ত্র সরবরাহ করা হচ্ছে।
এদিকে, প্রস্তাবিত অস্ত্রচুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও সমালোচনা হয়েছে। কয়েকজন মার্কিন রাজনীতিক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার এত বিপুল পরিমাণ ভারী বোমা সরবরাহের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। তবে ট্রাম্প প্রশাসন এ ধরনের অস্ত্র সরবরাহকে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহযোগিতার অংশ হিসেবে দেখছে।