হয়রানিমুক্ত ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ চান ব্যবসায়ীরা। যাতে দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, মানুষের দুর্দশা কমে ও অর্থনীতিতে গতি ফিরে আসতে পারে। তাহলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও রাজস্ব আদায় গতিশীল হবে। তারা বলছেন, বাজেটকে তৈরি করা হয় শাস্তিমূলক। এ বাজেটকে সহায়তামূলক করতে হবে। এ সময় তারা ব্যবসাবাণিজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে দেশের রাজস্ব ব্যবস্থা সংস্কার, করনীতি সহজীকরণের দাবি জানান।
বুধবার (২৯ এপ্রিল) রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও এফবিসিসিআইয়ের যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত পরামর্শক কমিটির ৪৬তম সভায় ব্যবসায়ীরা এসব বিষয় তুলে ধরেন। এতে সভাপতিত্ব করেন এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান। প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তিনি ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করে বলেন, শুল্ক-কর নিয়ে যতটা পারি করব। হয়তো পুরোটা পারব না, তবে ব্যবসা সহজ করতে আইনকানুন, নিয়মনীতি ব্যবসা সহায়ক করা হবে।
এর আগে সভায় ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের বার্ষিক করমুক্ত আয়সীমা ৫ লাখ টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব দিয়েছে এফবিসিসিআই। বর্তমানে এই করমুক্ত সীমা পৌঁনে ৪ লাখ টাকা। এফবিসিসিআইয়ের পক্ষ থেকে করপোরেট কর কমানোর প্রস্তাবও করা হয়। নন-লিস্টেড কোম্পানির ক্ষেত্রে করহার সাড়ে ২৭ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশ করা, টার্নওভার কর ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ করা, রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক খাতসহ সব শিল্প খাতের ওপর যে ১ শতাংশ হারে উৎসে কর আছে তা কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ করা ও এই করহার পাঁচ বছর অব্যাহত রাখার দাবি জানানো হয়।
সঞ্চালনা করেন এফবিসিসিআই প্রশাসক আবদুর রহিম খান। সভায় বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীরা তাদের দাবিদাওয়া তুলে ধরেন।
সভায় বাংলাদেশ রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশনের (রিহ্যাব) সিনিয়র সহসভাপতি আবদুর রাজ্জাক বলেন, করদাতাদের জন্য সহজ, আধুনিক ও হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করা গেলে রাজস্ব আদায় যেমন বাড়বে, তেমনি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশও তৈরি হবে। সঠিক ও ন্যায়সংগত করব্যবস্থা দেশের উন্নয়নের ভিত্তি শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান টি রহমান বলেন, এমন বাজেট দিতে হবে যা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, অর্থনীতিতে গতি ফিরিয়ে আনবে এবং সাধারণ মানুষের দুর্দশা লাঘবে সহায়ক হবে। আগামী বাজেট যেন শাস্তিমূলক না হয়ে সহায়তামূলক হয়। তিনি আয়কর, ব্যাংক ও কাস্টমসের জন্য সমন্বিত ইউনিফাইড ট্যাক্সপেয়ার প্রোফাইল চালু করাসহ ওয়ান-পেজ ডিজিটাল রিটার্ন দাখিলের ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দেন। এ ধরনের ব্যবস্থা চালু হলে করদাতার সংখ্যা বাড়বে, কর ফাঁকি কমবে এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশে স্বচ্ছ ও শক্তিশালী কর সংস্কৃতি গড়ে উঠবে।
তিনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক পিএসআর ও উচ্চ জরিমানার বিধান ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশকে বাধাগ্রস্ত করছে।
বাংলাদেশ রেস্টুরেন্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ইমরান হোসেন অভিযোগ করে বলেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সবাইকে ‘সিস্টেমেটিক্যাল চোর’ বানিয়ে রাখা হয়েছে। যারা ভ্যাট-ট্যাক্স দেয় এনবিআর তাদের বিরুদ্ধেই অভিযান চালায়। যারা দেয় না, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। বাংলাদেশ অ্যালুমিনিয়াম ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ওবায়দুর রহমান বলেন, আমাদের ইন্ডাস্ট্র্রি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, আমাদের এসব ইন্ডাস্ট্রিকে বাঁচান। ডাইরেক্ট ট্যাক্স বাড়ান। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে অফিসার পাঠান, সেখান থেকে প্রচুর আয়কর আদায় হবে।
বারভিডা সভাপতি আবদুল হক বলেন, একসময় দেশে প্রায় ৩০ হাজার গাড়ির বাজার ছিল। যা গত বছর ১০ হাজারের নিচে নেমে এসেছে। বিআরটিএর রেজিস্ট্রেশনও এখন এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। ডলারের দাম ও টাকার অবমূল্যায়নের কারণে মধ্যবিত্ত মানুষ আর গাড়ি কিনতে পারছে না। গাড়ির ওপর বিদ্যমান উচ্চ শুল্ক কমালে বাজারে গতি ফিরবে।
এফবিসিসিআইয়ের প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছে, দেশের সব ক্ষুদ্র ও মাঝারি পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের স্বার্থে স্থানীয় পর্যায়ে সব পণ্যের সরবরাহের ক্ষেত্রে ভ্যাট হার ২ শতাংশ করা, দেশে উৎপাদন হয় না এমন শিল্পের যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ, শিল্পের কাঁচামাল-উপকরণের আমদানিতে সর্বোচ্চ ১ শতাংশ আমদানি শুল্ক এবং দেশে উৎপাদন হয় এমন ধরনের যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ ও শিল্পের কাঁচামাল-উপকরণের আমদানিতে সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করেছে এফবিসিসিআই। এতে দেশি শিল্প সুরক্ষা পাবে বলে মনে করছে সংগঠনটি।
সভায় এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেন, ব্যবসায়ীরা এগিয়ে গেলে দেশের অর্থনীতিও এগিয়ে যাবে। নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য কর প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন দাবি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হবে। আগামী বাজেট প্রণয়নে ট্যাক্স ও ডিউটির ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের জন্য যতটা সম্ভব সহায়ক ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হবে। তিনি আরও বলেন, রাজস্ব কমপ্লায়েন্স প্রক্রিয়া আরও সহজ করতে এনবিআর কাজ করছে। ট্যাক্সের আওতা বাড়ানো অবশ্যই প্রয়োজন। বৈষম্য দূর করতে পুরো জাতি এ বিষয়ে একমত।