নাইজেরিয়ার সেনাসদস্যদের বেতন আবারও বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে দেশটির সরকার। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিভিন্ন পদমর্যাদার সেনাসদস্যরা সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধি পাবেন।
গত এক মাসের মধ্যে এটি সেনাবাহিনীর জন্য দ্বিতীয় দফা বেতন বৃদ্ধি।
নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট বোলা তিনুবু বলেছেন, দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় সেনাসদস্যদের সাহস, ত্যাগ এবং অবদানের স্বীকৃতি হিসেবেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের নিরাপত্তা হুমকির বিরুদ্ধে লড়াই করে আসা সেনাসদস্যদের প্রতি সরকারের গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অংশ হিসেবে বেতন বাড়ানো হচ্ছে।
এর আগে চলতি বছরের জুলাই মাসে প্রতিরক্ষামন্ত্রী সেনাবাহিনীর সর্বনিম্ন পদমর্যাদার সদস্যদের মাসিক বেতন ৩৬ ডলার থেকে বাড়িয়ে ৭৩ ডলার করেছিলেন।
পরে প্রেসিডেন্ট তিনুবুর হস্তক্ষেপে সেই বেতন আরো বাড়ানো হয়। আগামী সেপ্টেম্বর থেকে তারা মাসে ১৩২ ডলার করে বেতন পাবেন। সরকারের এই পদক্ষেপ দেশজুড়ে চলমান নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। নাইজেরিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ইসলামপন্থি জঙ্গিগোষ্ঠী, অপহরণকারী সশস্ত্র অপরাধী চক্র এবং অন্যান্য সহিংস গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে সেনাবাহিনী।
স্থানীয়ভাবে এসব অপহরণকারী গোষ্ঠীকে ‘ডাকাত’ নামে ডাকা হয়।
গত মাসে প্রেসিডেন্ট তিনুবু আরও ২৮ হাজার নতুন সেনাসদস্য নিয়োগের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে চারটি নতুন সেনা ডিভিশন গঠনের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়। সরকারের আশা, এর ফলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় দ্রুত সেনা মোতায়েন, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং নিরাপত্তা অভিযান আরো কার্যকর হবে। বর্তমানে নাইজেরিয়াজুড়ে চলমান নিরাপত্তাহীনতা দেশটির অন্যতম বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
বিশেষ করে ২০২৭ সালের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বিষয়টি আরো গুরুত্ব পাচ্ছে। বেতন বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়ে প্রেসিডেন্ট তিনুবু বলেন, ডাকাতি, অপহরণ এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যারা প্রতিদিন জীবন বাজি রেখে কাজ করছেন, তাদের সাহস ও আত্মত্যাগ জাতি সব সময় মনে রাখবে।
এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, দেশের নারী ও পুরুষ সেনাসদস্যদের যথাযথ সম্মান ও সমর্থন দেওয়া সবার দায়িত্ব। কারণ, তাদের কারণেই সাধারণ মানুষ নিরাপদে বসবাস করতে পারছেন। তিনি আরো বলেন, এই বেতন বৃদ্ধি যেন সেনাসদস্যরা দেশের প্রতি তাদের সেবার স্বীকৃতি হিসেবে গ্রহণ করেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে চাওয়া সব শক্তির বিরুদ্ধে সরকার ও সেনাবাহিনী একসঙ্গে সফল হবে। দীর্ঘদিন ধরে নাইজেরিয়ার সরকারগুলো নিরাপত্তা খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। সেনা মোতায়েন ও প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানো হলেও বিভিন্ন অঞ্চলে এখনো সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে।
দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বোকো হারাম এবং ইসলামিক স্টেট ওয়েস্ট আফ্রিকা প্রভিন্স (আইএসডব্লিউএপি) নিয়মিত হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-মধ্যাঞ্চলে ভারী অস্ত্রে সজ্জিত অপহরণকারী ও ডাকাত চক্র মুক্তিপণ আদায় এবং লুটপাট চালিয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী অস্থিরতা এবং কৃষক ও পশুপালকদের মধ্যে জমি নিয়ে সংঘর্ষও নাইজেরিয়ার জন্য বড় নিরাপত্তা সংকট।
নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাবেন জুনিয়র সেনাসদস্যরা। প্রাইভেট থেকে স্টাফ সার্জেন্ট পদ পর্যন্ত বেতন বাড়বে ৮০ শতাংশ। ওয়ারেন্ট অফিসার থেকে কর্নেল পদ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধি হবে ৫০ শতাংশ। আর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল থেকে জেনারেল পদ পর্যন্ত কর্মকর্তাদের বেতন বাড়বে ৩০ শতাংশ। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে নাইজেরিয়ার সেনাবাহিনীর বার্ষিক বেতন ব্যয় ৪৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার থেকে বেড়ে ৬৭ কোটি ৮০ লাখ ডলারে পৌঁছাবে।
অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ও সামরিক বিশ্লেষক বশির গালমা বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই সেনাবাহিনীর বেতন বাড়ানোর দাবি জানানো হচ্ছিল। তাই সরকারের এই সিদ্ধান্ত ইতিবাচক। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, বেতন খাতে এত বড় ব্যয় বৃদ্ধি ভবিষ্যতে সরকারের জন্য অর্থায়নের চাপ তৈরি করতে পারে। পরবর্তী সরকারগুলোর জন্য এই ব্যয় বহন করা কঠিন হতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। এদিকে কর্মরত কয়েকজন সেনাসদস্য মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, নতুন বেতনের অর্থ ব্যাংক হিসাবে জমা হওয়ার পরই তারা এ বিষয়ে কথা বলবেন। বশির গালমা বলেন, শুধু সেনাবাহিনী নয়, দেশের অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থার বেতনও একইভাবে পর্যালোচনা করা উচিত। কারণ দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সব বাহিনীর যৌথ দায়িত্ব।
তিনি আরো বলেন, শুধু বেতন বাড়ালেই হবে না। সেনাসদস্যদের কল্যাণের অন্যান্য বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে। তাদের জন্য মানসম্মত ইউনিফর্ম, বুট এবং আধুনিক রাইফেল সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। চলমান নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলায় এসব সরঞ্জামও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রেসিডেন্ট তিনুবু বলেছেন, তার সরকার ভবিষ্যতেও সেনাসদস্যদের কল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে। একই সঙ্গে আধুনিক অস্ত্র, প্রযুক্তি ও সামরিক সরঞ্জাম দিয়ে সশস্ত্র বাহিনীকে আরও শক্তিশালী করা হবে। সরকারের সাম্প্রতিক সংস্কারের ফলে এখন সারা দেশে সেনাবাহিনীর মোট ১২টি ডিভিশন থাকবে। সরকারের মতে, এতে নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় বাড়বে, গোয়েন্দা তথ্য দ্রুত আদান-প্রদান করা যাবে এবং যেকোনো সংকটে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।